ঝিনাইদহে ওএমএস চাল ও আটা বিক্রিতে অনিয়ম

একজনের ডিলারশিপ বাতিল

১৯

শাহারিয়ার রহমান রকি, ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহ সদর পৌর এলাকায় সরকারিভাবে খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) আটা ও চাল বিক্রিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ সবের সত্যতাও মিলেছে মনিটরিং টিমের তদারকিতে। ইতোমধ্যেই অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় শহরের জামতলা এলাকার মহিউদ্দিন আহম্মেদের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।

জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদর ও পৌর এলাকায় ১৩ জন ডিলার সপ্তাহে তিন দিন করে ওএমএস এর চাল ও আটা বিক্রি করছেন। এদের ডিলার প্রতি চালের বরাদ্দ ২৩০০ কেজি (২ টন ৩০০ কেজি) এবং আটার বরাদ্দও ২৩০০ কেজি। এই বরাদ্দ ভাগ করে তিন দিনের বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য উপজেলায় ডিলার রয়েছে ১৮ জন।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে করোনাকালে সাধারণ মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে সরকারিভাবে ঝিনাইদহে পৌর এলাকায় চলমান রয়েছে ওএমএস এর মাধ্যমে খোলা বাজারে চাল ও আটা বিক্রি কার্যক্রম। এখানে জন প্রতি ৩০ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি চাল ও ১৮ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি আটা দেওয়ার কথা।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই আটা ও চাল বিক্রির ক্ষেত্রে কেজিতে দুই টাকা বেশি নেওয়া, ক্রেতাদের সাথে দুর্ব্যবহার, আটা নিলে চাল দেওয়া হয় না, চাল নিলে আটা দেওয়া হয় না, সরকারি চাল গোপনে বিক্রির মত অভিযোগ ওঠে ওএমএস এর ডিলারদের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রায় এক মাস আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, জেলা তথ্য কর্মকর্তা, জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তাসহ ৭টি দপ্তরের প্রধানদের নিয়ে ওএমএস মনিটরিং টিম গঠন করা হয়।

ওই টিমের তদারকিতে ইতোমধ্যেই জেলা শহরের জামতলা এলাকার মহিউদ্দিন নামে ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়ম মেলায় তার ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ দিন আগে ব্যাপারী পাড়ার ফজল মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৫০ কেজি মজুদ চাল এবং ১০ দিন আগে মুক্তিযোদ্ধা রুহুল কুদ্দুস সড়কের শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও মেলে একই অভিযোগের সত্যতা। পরে তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।
এছাড়া সাধারণ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার তো রয়েছেই। এসব কারণে ওএমএস এর চাল ও আটা কিনতে এসে চরম ক্ষুব্ধ সাধারণ ক্রেতা।

শহরের জামতলা এলাকায় আটা কিনতে আসা ক্ষুব্ধ এক ক্রেতা জানান, প্রথম দিন আটা কিনতে আসলে বলেÑ পাঁচ কেজি আটা একশ’ টাকা দাম। দাম বেশি নিচ্ছেন কেন জিজ্ঞাসা করলেই ডিলার বলে এই দামেই নিতে হবে আর চাল নিলে আটা দেবো না, আর আটা নিলে চাল দেবো না। এই দামেই আটা কিনে নিয়ে বাড়ি গিয়ে দেখি আধা কেজি কম।

শহরের খাজুরা এলাকার গৃহবধূ মর্জিনা বেগম জানান, আমরা খুবই গরিব মানুষ, ছেলের ইনকামে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। তাই কম দামে পাওয়া যায় বলে ওএমএস এর পাঁচ কেজি আটা ও পাঁচ কেজি চাল কিনতে গিছিলাম। কিন্তু আমাকে চাল না দিয়ে ১০ কেজি আটা দিলো। দাম নিলো ২০ টাকা কেজি।

গাংপাড়া এলাকার বৃদ্ধা জানান, সকালে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি, দুপুর হলেও আমাকে চাল দিলো না। কেন চাল দিলো না জানতে চাইলে বলে, বস্তা ধরে চাল বিক্রি হবে। আর খুবই বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করলো চাল বিক্রেতারা। এরপর কিছুক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম রিকশায় করে একটা মধ্য বয়সী মানুষ এসে তিন বস্তা চাল কিনে নিয়ে গেল।

ব্যাপারী পাড়া এলাকায় চাল কিনতে আসা জোনাব আলী জানান, সংসারে অভাব, আর বাজারে চালের দাম ৬০ টাকা কেজি। তাই এখানে যদি ৩০ টাকা কেজি দরে চাল পায়, তাহলে আমাদের অনেক সাশ্রয় হয়। কিন্তু ডিলাররা তো তা করে না। দাম তো বেশি নেয়ই। আবার বাইরে গোপনে সরকারি চাল আমাদের না দিয়ে বিক্রি করে দেয়। এতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে।

অপর ক্রেতা সুলতানা পারভীন জানান, সরকার সাধারণ মানুষের জন্য কম দামে চাল আটা দেচ্ছে। কিন্তু সেই সুবিধা যদি না পায় তাহলে এটা বিক্রি করে লাভ কি। আমাদের উপকার হবে না আর বিক্রেতারা নিজেদের পেট ভরবে তা তো হতে পারে না।

ওএমএস ডিলার মহিউদ্দিন আহম্মেদ জানান, যখন টাকাটুকি থাকে না তখন হয়তো চাল একটু এদিক ওদিক করা হয়। তাছাড়া সবই ঠিক থাকে।

এছাড়া অন্যান্য ওএমএস ডিলাররা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই চাল-আটা বিক্রি করা হচ্ছে। কোন অনিয়ম করছি না। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ একেবারেই সঠিক না।

ওএমএস মনিটরিং টিমের সদস্য ও জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুচন্দন মন্ডল জনান, গেল দুই-তিন মাস যাবত খাদ্য বিভাগের চাল আটা বিক্রি করা ওএমএস এর কিছু ডিলাররের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আসছিল। এরই প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্রে আমরা তদারকি শুরু করি। এরপর থেকেই কিছু অনিয়ম উৎঘাটন করা হয় এবং আইনগগত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, তাদের অনিয়ম ধরতে ক্রেতা সেজেই লাইনে দাঁড়ায় চাল কিনতে জামতলা বিক্রয় কেন্দ্রে। কিছুক্ষণ পরে আমাকে জানায়, চাল বিক্রি হচ্ছে না। আটা বিক্রি শেষ হলে তারপর চাল বেচবো। পরে স্থানীয় ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি কেজিতে চাল-আটা দুটোতেই দুই টাকা বেশি দাম নেন। এছাড়াও স্থানীয়রা জানায়, এই ডিলার চাল বাইরে বিক্রি করে দেন।

তার এই অভিযানে সাথে থাকা অপর মনিটরিং টিমের সদস্য ও জেলা তথ্য কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দীক জানান, দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের কাছে অভিযোগ আসছিল জামতলা এলাকার ওএমএস ডিলার মহিউদ্দিন সাহেব চাল ও আটার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে তদন্তে আসলে ঘটনার সত্যতা মেলে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হয়েছে আইনগত ব্যবস্থা নিতে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেখ আনোয়ারুল করিম জানান, ডিলার মহিউদ্দিন’কে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তার ডিলারশিপ বাতিল করে খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, অনিয়ম হচ্ছে না তা নয়, টুকটাক অনিয়ম হচ্ছে এমনটা শুনেছি, হচ্ছেও। কিন্তু মনিটরিংয়ের জন্য লোকবল সংকট আছে। একজন লোককে পাঁচ জায়গা-তিন জায়গা দেওয়ার দায়িত্ব। কিন্তু লোকবল না থাকায় তা করা যায়নি। কারণ ইন্ডিয়া থেকে এলসি’র মাধ্যমে যে চাল আসছে সেখানে কাজ করার জন্য আমাদের জেলা থেকে চারজনকে নিয়ে গেছে। এর কারণে কিছুটা ত্রুটি বিচ্যুতি হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করছি কড়া মনিটরিংয়ে আনতে।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান জানান, করোনাকালে সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমজুরসহ দরিদ্র মানুষের জন্য ওএমএস কার্যক্রম চালু রেখেছে যাতে করে তারা অল্প টাকায় কিনে খেতে পারে। তবে কিছু জায়গা থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসছে। মনিটরিং টিমের রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে অফিসাররা ওএমএস বিক্রয় পয়েন্টে বসে থেকে বিক্রয় কার্যক্রম তদারকি করছে।

মন্তব্য
Loading...