গ্রাহকের দুই কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট

0 ২৯

এসকে সুজয়, নড়াইল

প্রায় ২ হাজার গ্রাহকের ৩ মাসের বিদ্যুৎ বিলের ৫ লক্ষাধিক টাকা আর জামানতের ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে ব্যাংক এশিয়ার চাচুড়ী বাজারের এজেন্ট খায়রুল বাশার। ব্যাংকে আমানতের টাকা জমা হয়নি এই খবর পেয়ে গ্রাহকেরা হতাশ হয়ে ভিড় করছেন ব্যাংকে। ব্যাংক থেকে গোপনে কম্পিউটার সরানো এবং ৫০ হাজার টাকা ভাড়া বকেয়া পড়ায় ভবন মালিক ব্যাংকে তালা মেরে দেন।

ব্যাংক এশিয়া সূত্রে জানা যায়, কালিয়া উপজেলার চাচুড়ী শাখাটি ২০১৯ সালের জুন মাসে স্থাপন হয়। স্থানীয় চন্দ্রপুর গ্রামের খায়রুল বাশার এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ পান। বর্তমানে শাখাটিতে ডিপিএস, মেয়াদী আমানত ও সঞ্চয়ী হিসাব মিলে ১ হাজার ৩০০ গ্রাহক নিয়মিত লেনদেন করেন। এরমধ্যে বেশিরভাগই মেয়াদী আমানতের গ্রাহক। প্রতি মাসে ২ হাজারেরও বেশি বিদ্যুৎ গ্রাহক বিল পরিশোধ করে থাকেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ব্যাংকটিতে পল্লী বিদ্যুতের বিল নেয়া শুরু হয়। আশেপাশের ৪ ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার গ্রাহক এখানে বিদ্যুৎ বিল জমা দেন। মার্চ মাস থেকে বিদ্যুৎ বিলে বকেয়া আসতে থাকায় গ্রাহকেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, জমাকৃত বিলের টাকা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জমা হয়নি। এই অবস্থা পরবর্তী এপ্রিল ও মে মাসে চলতে থাকে। বিদ্যুৎ বিলের ঘাপলার কারণে ধীরে ধীরে বের হতে থাকে অন্য জামানতের টাকার হিসাব।

ব্যাংকিং পদ্ধতির বাইরে নিজ উদ্যোগে গ্রাহককে এককালীন জামানতে মাসিক বেশি অর্থ প্রদানের লোভ দেখিয়ে কয়েকশ গ্রাহকের কাছ থেকে এককালীন জামানত নিয়ে ব্যাংকে জমা না দিয়ে নিজে হাতিয়ে নেন। এমনকি এজেন্ট অফিসে ১০ থেকে ১২ জন কর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২/৪ লাখ টাকা করে নিয়েছেন এজেন্ট কাম এমডি খায়রুল বাশার।

ডহর চাচুড়ী গ্রামের মৎসজীবী পিটু বিশ^াস। মাছ ধরে ৩ লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন বাড়ি বানানোর জন্য। লাখে মাসিক ৮শ টাকা পাবেন এই আশায় স্ত্রী লাকিয়া’র নামে ৩ লাখ টাকা জামানত রেখেছিলেন। ৮ জুন ব্যাংকে এসে জানতে পারেন, তার নামে ব্যাংকের হিসাবে কোন টাকাই জমা হয়নি।

পিটু বিশ^াস বলেন, ঘরের জন্য কিছু টাকা জমাইছিলাম। ভাবছিলাম আরো কিছু জমায়ে ঘরটা তুলবো। এখন আমার ঘর তোলার স্বপ্নই নষ্ট করে দিলো বাশার।

চাচুড়ী গ্রামের কোহিনুর বেগম আড়াই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রেখে দুই মাসে সুদ পান। মে মাসে টাকা নিতে এসে দেখেন ব্যাংকে তালা মারা। এজেন্ট হাওয়া। অসহায় কোহিনুর বলেন, ছেলের পাঠানো অনেক কষ্টের টাকাগুলো জমা রেখেছিলাম। এখন তো সবই হাওয়া। আমি কি আত্মহত্যা করবো নাকি?

এরকমভাবে ডহর চাচুড়ী গ্রামের মফিজুর রহমান ১৫ লাখ, পুরুলিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর শেখ ১২ লাখ, হাসান শেখের দেড় লাখ টাকাসহ কয়েকশ গ্রাহকের দুই কোটি জামানতের টাকার কোন হদিস নাই।

ব্যাংক শুরুর পরে কর্মীদের চাকরি দেবার নাম করে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা করে নেয়া হয়। নিজস্ব কায়দায় মাসিক লাভের কথা বলে হাতিয়ে নেয়া টাকার ব্যাপারে মুখ খুলতে শুরু করেছেন কর্মীরা। এরমধ্যে ফারজানার কাছ থেকে ২ লাখ, ফজিলার কাজ থেকে ২ লাখ, লাকি খানম আর অনিক নামে হিসাবে কাজ করা দুই কর্মীর কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নেয় খায়রুল। এসব কর্মীরা এখন ক্ষোভে ফুঁসছেন। পাশাপাশি গ্রাহকের গালি শুনছেন তারা।
ব্যাংকের এমন জালিয়াতিতে ক্ষুব্ধ বাজারের ব্যবসায়ীরা। চাচুড়ী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ব্যাংকে মানুষ আস্থা নিয়ে টাকা জমা রাখে আর তা লুট হয়ে যায়। আমি প্রশাসনের কাছে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছি। গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে এজেন্ট পালিয়ে গেল অথচ তা ধরতেই পারলো না ব্যাংকের কর্মকর্তা।

ব্যাংক এশিয়া’র নড়াইল শাখার ম্যানেজার ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত ভাউচারে টাকা গ্রহণ করলে গ্রাহক তা ফেরত পাবে। মূলতঃ এজেন্ট ব্যাংকে টাকা জমা হবার পরে রশিদ প্রিন্ট হয়ে বের হয়, এখানে অধিকাংশ ভাউচারই নকল।

ঢাকা থেকে আসা ব্যাংক এশিয়ার অডিটর আব্দুল্লাহ বাকী বলেন, আমরা গ্রাহকের অভিযোগ সংগ্রহ করছি, এখানে এজেন্ট যে ধরনের জালিয়াতি করেছে তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।

ব্যাংক এশিয়ার রিলেশানশিপ কর্মকর্তা লিকু আহম্মেদ জানান, এজেন্ট বিদ্যুৎ বিলের টাকা জমা নিয়ে রশিদ দিলেও সে টাকা ব্যাংকে জমা করেনি। বুধবার পর্যন্ত এজেন্ট কর্তৃক ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছি। এজেন্ট শাখাটিতে নিরীক্ষা কাজ চলছে।

এদিকে চন্দ্রপুর গ্রামের ইমাদুল খানের ছেলে এজেন্ট খায়রুল বাশারের মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি কালিয়া’র ডিজিএম মমিনুর রহমান বিশ্বাস বলেন, এলাকার প্রায় ২ হাজার গ্রাহক সেখানে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ওইসব গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকা গ্রহণ করলেও এজেন্ট সে টাকা জমা না দেয়ায় গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। ঘটনাটি ঊর্ধ্বৃৃৃৃৃৃতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সহকারী পুলিশ সুপার (কালিয়া সার্কেল) প্রনব কুমার সরকার বলেন, পুলিশ চাচুড়ী বাজারের এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। এলাকার মানুষের অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য
Loading...