বিশ্ব পরিবেশ দিবস : প্রয়োজন সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ

৬৮

তাপস মজুমদার

মানবসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পরিবেশ। পরিবেশকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পারলে ভালো থাকবে পৃথিবীর জীব ও প্রাণীকুল। পরিবেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে মানুষ অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবনের বিকাশ ঘটে। পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত কার্যক্রম বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত জাতিসংঘের উদ্যোগে সর্বপ্রথম বৃহৎ আকারে সুইডেনের রাজধানী স্কটহোমে পরিবেশ সংক্রান্ত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সম্মেলনের শুরুর দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জাতিসংঘ ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৩ সালে থেকে প্রতিবছর ৫ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

এই দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু প্রতিবছর এই দিনটি যথাযথ মর্যদার সাথে পালিত হলেও আমরা পারছি না আমাদের পরিবেশকে সুস্থ রাখতে, পারছি না পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে। এই না পারার জন্য যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক কারণ তেমনি রয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট কারণ। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই প্রকৃতি বিরূপ আচরণ শুরু করেছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা আজ পৃথবীর জীবকুল ও উদ্ভিদ জগতের জন্য মারাত্মক হুমকির সন্মুখীন।

পরিবেশ দূষণের কারণে প্রকৃতি আজ তার ভারসাম্য হারাতে বসেছে। এ করণে প্রতিবছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নানা ধরণের রোগ-ব্যাধি বিভিন্ন ধরণের ভাইরাসের আক্রমণ অতিমারি, মহামারি সর্বোপরি ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের মরুময়রূপ, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যায় আমরা জর্জরিত। নির্বিচারে প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ আজ বিপন্ন। মানুষের কার্যকলাপের ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের বহু প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সর্তক করলেও বিষয়টি যেন গুরুত্ব পাচ্ছে না। গ্রিনহাউস অ্যাফেক্ট, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বনভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, দ্রুত শিল্পায়ন, শব্দ দূষণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনজ সম্পদ বিনষ্ট, বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের অপব্যবহার, যুদ্ধ ও সংঘর্ষ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, পানি দূষণ, শিল্প দূষণ, কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ, দারিদ্র্য, প্রসাধনসামগ্রী, পলিথিন ও প্লাস্টিক, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া ইত্যাদির কারণে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে আমাদের পরিবেশ। এই সমস্যা শুধু যে আমাদের দেশে তা নয়। সারা বিশ^ আজ দূষণজনিত কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের সন্মুখীন। নানা ধরণের দূষণজনিত কারণে পৃথিবী হারাতে বসেছে তার ভারসাম্য। পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে ক্রমাগত। প্রতিনিয়ত হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন, বাড়ছে পৃথিবীর উষ্ণতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’য় গডার্ড ইনস্টিটিউট এর গবেষণায় জানা গেছে, বৈশি^ক তাপমাত্রা প্রতিবছর তার পূর্ববতী বছরের রেকর্ড ভেঙে বেড়েই চলেছে। বৈশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো শীতল অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে একদিকে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অন্য দিকে বরফ গলে যাওয়ার কারণে দ্বৈত চাপ পড়ছে পৃথিবীর উপর। যা মোকাবিলা করা মানুষ ও প্রকৃতির জন্য খুব কঠিন। পরিবেশ দূষণের কারণে এ ভাবে যদি পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে থাকে তাহলে জীবকুলের জন্য একমাত্র জীবনধারণের উপযোগী পৃথিবী হারাবে তার স্বাভাবিকতা। দূষণজনিত কারণে নানা ধরণের দুর্যোগে আমাদের বাসযোগ্য পৃথিবী হবে ক্ষতবিক্ষত। পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে আমরা যদি এখনি আমাদের পৃথবীকে সুস্থ করে তুলতে না পারি তাহলে এখানে প্রাণীকুলের টিকে থাকাটা হবে দুর্বিষহ। পৃথিবীর দূষণ মুক্ত ও সুস্থ রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৭০ সালে প্রথম ওয়ার্ল্ড ওয়াচ ইনস্টিটিউট, ওয়াশিংটনের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জীবজগতের জন্য উপযোগী একমাত্র গ্রহ পৃথিবীর ভয়াবহ দুর্দশা মোচনের লক্ষ্যে পালন করে ‘পৃথিবী দিবস’। সাড়ম্বরে এই ‘পৃথিবী দিবস’ বা ‘পৃথিবী বষর্’ পালনের লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর মানুষকে তাদের মাতৃভূমি পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা। পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করা। এই গ্রহের লুপ্ত স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারের একটি ব্যাপক কর্মসূচি প্রণয়নে সমগ্র মানবজাতিকে উদ্বুদ্ধ করা। তারপর পার হয়েছে কয়েক দশক আমরা কি পেরেছি আমাদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন পৃথিবী নামক প্রিয় গ্রহ যেখানে জীব ও প্রাণীকুলের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, পানি তাকে সুস্থ সবল রাখতে। পারেনি, বরং প্রতিনিয়ত পৃথিবীর পরিবেশকে করছি দূষিত। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শিল্প বিপ্লবের যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক বিপ্লব সূচিত হয়েছে সারা বিশ্বে। নানা ধরণের শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে দেশে দেশে। কিন্তু শিল্প কারখানা গড়ে উঠার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও রয়েছে। কতটুকুই বা মানা হচ্ছে সেই নীতিমালা। শহরের প্রাণকেন্দ্রে শিল্প কারখানা, কিংবা শিল্প কারখানা সংলগ্ন বসতি স্থাপন যেন অতিসাধারণ ঘটনা। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়ায় শহরাঞ্চল হচ্ছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সুনির্দিষ্ট নিয়ম লঙ্ঘন করে ইটের ভাটা স্থাপন করা হচ্ছে যেখানে সেখানে। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশে পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, ব্যবহার বিপণন ও বাজারজাতকরণের আইন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তারপর বেশ কিছুদিন বাজারে দেখা যায়নি পলিথিনের শপিং ব্যাগ। কিন্তু বর্তমানে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার আবারও পূর্বের ন্যায়। আমাদের দেশের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। কিন্তু সেই মাটিকে প্রতিনিয়ত আমরা দূষিত করে তুলছি অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহর ও পলিথিন ব্যবহারের কারণে। পরিবেশকে স্গ্ধনি শীতল রাখা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। আমাদের আছে কি? বরং আমরা নির্বিচারে ধ্বংস করছি বনভূমি। অথচ আবহাওয়র তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হ্রাসে বায়ুর কার্বন ডাই-অক্সাইড এর ভারসাম্য রক্ষাসহ নির্মল বায়ুর জন্য প্রয়োজন সবুজ অরণ্য। সে কারণে পরিবেশকে ভালো রাখতে হলে বনভূমি রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে।
কোন কারণে একটি গাছ কাটলে দুইটি গাছ রোপণ করতে হবে। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌর ও পানি বিদ্যুতের মতো উৎস ব্যবহার করতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে, পানি ও বায়ু দূষণ রোধ করতে হবে, পরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্প কারখানা স্থাপন করতে হবে। সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব মানসিকতা তৈরি করতে হবে সকলকে। সকলে সচেতন হলে আমাদের পরিবেশ সুস্থ ও সুন্দর থাকবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

মন্তব্য
Loading...