আজ সাম্যের কবি নজরুলের জন্মদিন

0 ৪৮

প্রণব দাস

আজ থেকে ১২২ বছর আগে ১১ জ্যৈষ্ঠ বাংলার সাহিত্যে জন্ম হয়েছিল এক অগ্নিপুরুষের। যার রচনায় স্বদম্ভে উচ্চারিত হয় ‘প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ…’। রচিত হয় শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা। মানবতার মুক্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপম-ূকতার বিরুদ্ধেও যার লেখনি ছিল সোচ্চার। নির্ভীক চিত্তে যিনি কলম ধরেছেন মুক্তবুদ্ধি চর্চায়। অগ্নিবীণা হাতে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে তার। তিনি লেখেন ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান…’। তিনি তার কবিতায় বলেছিলেন ‘পূজিছে গ্রন্থ ভ-ের দল মূর্খরা সব শোন/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন…’।

রাবিন্দ্রীক ভাবধারার বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তার সচেতন স্বতন্ত্র বিদ্রোহী সত্ত্বার পরিচয় পাওয়া যায় তার নিজ জবানবন্দিতে। ‘আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি- অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে- যা মিথ্যা কলুষিত পুরাতন পঁচা সেই মিথ্যা- সনাতনের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে ভ-ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে’। ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য অমূর্ত কৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত’।
এমন সাহসী চরণ রচনার কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি, প্রেমের কবি, অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বিদ্রোহী কবি, বাংলার জাতীয় কবি যার অগ্নিঝরা রক্তক্ষরা লেখনী, আবার দরদি মনের বহুমুখীধারা- যা দেশ, সমাজ, মানবধর্ম, প্রেম ও সংগীতের সেবায় প্রতিনিয়ত নতুন সৃষ্টিতে মত্ত তিনি কাজী নজরুল ইসলাম।

যিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এ ক্ষণজন্মা বিরল প্রতিভার মানুষটির ১২৩তম জন্মদিন আজ।
১১ জ্যৈষ্ঠ মানেই দেশজুড়ে নজরুলজয়ন্তী উদযাপন করা। এদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে উদযাপন করা হয়। নজরুলজয়ন্তীতে তার লেখা গান, কবিতা, নাটক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এ বিরল প্রতিভাকে স্মরণ করা হয়।

কিন্তু বৈশি^ক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সেকেন্ডে ওয়েভের করাল গ্রাস মোকাবিলায় গত বছরের মতো এবারো গৃহবন্দি (লকডাউন) সারাদেশের মানুষ। তাই প্রতিবছর যেমন আয়োজন করে উদযাপন করা হয় কবির জন্মদিন; গতবছরের মতো এ বছরও সেভাবে পালন করা হবে না। যা সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের জন্য বেদনাদায়ক। কিন্তু ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন পরিবেশে আজ তাকে স্মরণ করবে মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে দ্রোহ, প্রেম ও মানবতার কবি নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবে।

এমনটাই জানালেন যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসভাপতি সুকুমার দাস।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১২২ বছর আগে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যবয়সে কাজী নজরুল পিকস্ ডিজিজে আক্রান্ত হন এবং এক সময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে নির্বাক হয়ে যান।

১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তাকে ‘একুশে পদক’ এ সম্মানিত করা হয়।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেন। ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ তার আকুতিমাখা অবিস্মরণীয় লেখা গানের প্রতি সম্মান জানিয়ে ওইদিনই বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯৭৩-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট উপাধি পাওয়া আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের অনেক অপূর্ণ ইচ্ছার মধ্যে অন্তিমে হয়তো এই একটি ইচ্ছা অন্তত তারই অজ্ঞাতে পূর্ণ হয়।

নজরুল ইসলামের বাবা কাজী ফকির আহমেদ ও মা জাহেদ খাতুন। ফকির আহমেদের ২ স্ত্রী, সাত পুত্র, ২ কন্যা। নজরুলের সহোদর জ্যেষ্ঠ সাহেবজান, কনিষ্ঠ আলী হোসেন ও বোন উম্মে কুলসুম। তারা দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। জ্যেষ্ঠ সাহেবজানের পর চার পুত্রের মৃত্যু হয়। তারপর পৃথিবীতে স্মরণীয় বরণীয় হতে মা বাবার কোল জুড়ে ‘অগ্নিবীণা হাতে ধুমকেতু’র মতো জন্ম নেন নজরুল ইসলাম। তাকে সবাই ডাকত ‘দুখু মিয়া’ বলে।
তিনি ৮ বছর ৮ মাস বয়সেই পিতৃহারা হন। ১০ বছর বয়সেই প্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করেই সেই মক্তবে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন। সঙ্গে চলছিল মসজিদের ইমামতি ও মাজার শরীফের খিদমত। সেই ছোটবেলা থেকেই সংসারের পুরো দায়িত্ব তুলে নেন তিনি। অসহ্য দারিদ্রের সাথে সংগ্রামে তিনি শৈশবেই দারিদ্র্যকে জয় করেছিলেন। তাই পরিণত বয়সে লিখতে পেরেছিলেন- হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান…।

তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্য রচনায় তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল ইসলাম প্রায় ৩ হাজার রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।

নজরুল ইসলামের প্রথম গদ্য রচনা ছিল ‘বাউ-ুলের আত্মকাহিনী’। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন তিনি। সৈনিক জীবন থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’, ‘ঘুমের ঘোরে’। ১৯২২ সালে নজরুল ইসলামের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ‘ব্যথার দান’।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে এ বিরল প্রতিভা আমাদের প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তার শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা খুকী ও কাঠবিড়ালি , লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ।

১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে।

অগ্নিবর্ষণী লেখনীর খোঁচায় কবির বিদ্রোহের দূর্বার গতির পরিচয় প্রকাশ পায়- তিনি লিখেছেন- ‘আমার কন্ঠে কালভৈরবের প্রলয় তূর্য বেজে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশান পুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নটনারায়ন রূপ ধরে ধ্বংস নাচন নেচেছিল। এ ধ্বংস নৃত্য নবসৃষ্টিতে পূর্ব সূচনা। তাই আমি নির্মম নির্ভীক উন্নতশীরে সে নিশান ধরেছিলাম, তার তূর্য বাজিয়েছিলাম, তার রক্ত আঁখির হুকুম আমি ইঙ্গিতে তখনই বুঝেছিলাম, আমি সত্য রক্ষার, ন্যায় উদ্ধারের বাহিনীর লাল সৈনিক’। নিজের প্রতি এমন আস্থা তাঁকে নিয়ে গেছে অমরত্বের পথে।

‘কবি প্রতিভা বহুমুখী, বহুচারী। তিনি সাহিত্য ও সংগীতের প্রচলিত সকলক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ করেই স্থিতি হননি, বহু নতুন নতুন ক্ষেত্রও উন্মোচন করেছেন। যা সাহিত্য ও সংগীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। অথচ তার প্রতিভার প্রকাশকাল মাত্র ২২ বছর। ৪২ বছর বয়স থেকেই কবি অর্ধচেতন মৌনযোগী। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই কবির রচিত গানের সংখ্যা পৃথিবীর সব গীত রচয়ীতাকে পেছনে ফেলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। কবির রচিত গানের আলোকেই কবিচরিত্রের সত্যিকারের পরিচয় প্রকাশ পায়। তার বিচরণ সর্বক্ষেত্র হলেও এ কথা স্বীকার করতে হয়, যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আয়োজনে তার বিদ্রোহী চেতনা অন্য সব কাজ ও গীতধারা কে পেছোনে ফেলে রেখে অনেক অনেক এগিয়ে গেছে। তাই নজরুল নামটি মনে আসার সাথে সাথে বিদ্রোহী বিশেষণটি তার নামের আগে স্থান দখল করে নেয়। প্রতি ক্ষেত্রে সংকল্প ছিল দৃঢ়, তাই জয়ের ধারণা ছিল তার সুনিশ্চিত।’ তার সর্বমুখী বিদ্রোহীতার উদ্দাম স্রোতে ‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী’ এ ধারণাতেই তিনি গেয়েছেন- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’।

মন্তব্য
Loading...