পরপারে বরেণ্য রাজনীতিক কাজী আব্দুস শহীদ লাল

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত

৩২

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যমত পুরোধা ব্যক্তিত্ব ভাষাসৈনিক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিশিষ্ট আইনজীবী কাজী আব্দুস শহীদ লাল চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বৃহস্পতিবার ভোর বেলা যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এদিন বিকেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর পর গার্ড অব অনার প্রদান ও জানাজা শেষে তাকে কারবালা কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ও কিডনি রোগে ভুগছিলেন। মরহুমের ভাই কাজী আব্দুস সবুর হেলাল জানান, বৃহস্পতিবার ভোর চারটার দিকে নিজ বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে যশোরের কুইন্স হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এদিকে অভিভাবকতুল্য বর্ষীয়ান এ ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে যশোরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। অকেনেই তার পুরাতন কসবা কাজী পাড়াস্থ বাসভবনে তাকে শেষ বারের মত দেখার জন্য ছুটে যান।

বিকেলে বাড়ি থেকে জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করে মরহুমের মরদেহ উদীচী প্রাঙ্গণের সত্যেন মঞ্চে আনা হয়। এখানে মরহুমের কফিনে উদীচীর সংগঠন পতাকায় আচ্ছাদিত করে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান প্রেসক্লাব যশোর, যশোর সংবাদপত্র পরিষদ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পুনশ্চ যশোর, সুরধুনী সংগীত নিকেতন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জেলা মহিলা পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, সুরবিতান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, জন উদ্যোগ, গ্রামের কাগজ, সাবেক ছাত্র নেতা প্রভাত ব্যানার্জী, সুর নিকেতন, কেশবপুর উদীচী, স্পন্দন, বীরমুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী, উৎকর্ষ, ওয়ার্কার্স পার্টি, চাঁদেরহাট, সুজন শ্রোতা-কিংশুক, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদ, জাগপা, অক্ষর শিশু শিক্ষালয়, মুনশী রইসউদ্দীন সংগীত একাডেমি, যশোর ইনস্টিটিউট, উদীচী মাইকেল মধুসূদন কলেজ শাখা ও উদীচী যশোরের নেতৃবৃন্দ।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব জানান, উদীচী যশোরের উপদেষ্টা কাজী আব্দুস শহীদ লালের মৃত্যুতে উদীচী পরিবার শোকাহত। তার মৃত্যুতে উদীচী যশোরের পক্ষ থেকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

উদীচী প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান শেষে মরহুমের মরদেহ আইনজীবী সমিতির এক নম্বর ভবন প্রাঙ্গণে আনা হয়। এখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান যশোর জেলা আইনজীবী সমিতি, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, যশোর জেলা আইনজীবী ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, প্রসিকিউশন ইউনিট, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদ, জাতীয় শ্রমিকলীগ, জাতীয় যুব শ্রমিকলীগ, জাতীয় পার্টি, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে), তির্যক, স্পন্দন, বাউলিয়া সংঘ, ক্যাম্পাস থিয়েটার আন্দোলন বাংলাদেশ- যশোর জেলা সংসদ, সৃষ্টিশীল সাহিত্য ও সংগীত একাডেমির নেতৃবৃন্দ।

আইনজীবী সমিতির এক নম্বর ভবন প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর পর গার্ড অব অনার প্রদান ও জানাজার জন্য মরহুমের কফিন আনা হয় ইদগাহে।

এখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন জেলা ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সম্মিলন ইনস্টিটিউশন প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ, জাসদ, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিকলীগ, যশোর রিকশা-ভ্যান শ্রমিকলীগ, জাতীয় শ্রমিকলীগ, যশোর জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন, বঙ্গবন্ধু আইন ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, উদীচী গদখালি শাখা।

শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর পর্ব শেষে গার্ড অব অনার জানান, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকির হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, সহসভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা একেএম খয়রাত হোসেন, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, পৌরমেয়র বীরমুক্তিযোদ্ধা হায়দার গীন খান পলাশ, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিদ্য ইসলাম অমিত, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক পৌরমেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ প্রমুখ।

জানাজার আগে মরহুমের ভাই কাজী আব্দুস সবুর হেলাল ও একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার কাজী রেফাত রেজওয়ান সেতু উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য তুলে ধরেন। এরপর জানাজা শেষে কারবালা কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

মরহুমের একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার কাজী রেফাত রেজওয়ান সেতু জানান, তার বাবা ১৯৩৯ সালের ২৮ নভেম্বর যশোর জেলার বাঘারপাড়া থানার বন্দবিলা ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের কাজী বাড়িতে কাজী আব্দুল গণি এবং মরিয়ম বেগমের তৃতীয় সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) নেতা ছিলেন তিনি। পরে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ (মোজাফ্ফর), সিপিবি এবং শেষে গণফোরামের রাজনীতি করেন। প্রায় এক যুগ তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থেকে সামাজিক ও মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

যশোর আইনজীবী সমিতির তিনবার সভাপতি ও তিনবার সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত ছিলেন কাজী আব্দুস শহীদ লাল। তিনি যশোরে উদীচীর জন্মলগ্ন থেকে সংগঠক হিসেবে বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পাল করেছেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখার সভাপতি হারুন অর রশিদ জানান, ’৫২ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬২ শিক্ষা আন্দোলন; যে আন্দোলনে তাকে পাকিস্তান সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দেয়। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বাধিনতার পর সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে, কৃষক শ্রমিকের দাবি আদায়ের স্বপক্ষে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বপক্ষে সমস্ত আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ‘যশোরের মানুষের একজন অতি আপনজন ও অভিভাবককে আমরা হারালাম’- বলে জানান তিনি।

এদিকে অ্যাড. কাজী আব্দুসস শহীদ লালের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

এছাড়াও শোক প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের সভাপতি আমিরুল ইসলাম রন্টু, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ ইকবাল, জাসদের কার্যকরী সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. রবিউল আলম, যশোর জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. অশোক কুমার রায়, সদর উপজেলা জাসদের সভাপতি আহসান উল্লাহ ময়না, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আবুল কায়েস, সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফ আহমেদ বাপী, পৌর জাসদের সভাপতি জাকির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবর, জেলা যুব জোটের সভাপতি সোহেল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার মুকুল, নারী জোটের সভাপতি নূর জাহান মজিদ, সাধারণ সম্পাদক জেসমমিন আহমেদ বীণা, জেলা ছাত্রলীগ (জাসদ) সভাপতি তাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক জিতু খন্দকার, বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল ও সাধারণ সম্পাদক দীপংকর বিশ্বাসসহ সংগঠনের সকল সদস্যবৃন্দ।

আরো শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন ও সম্পাদক আহসান কবীর, কিংশুক যশোরের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল করিম সোহেল, ওয়ার্কার্স পার্টি যশোর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাড. আবুবকর সিদ্দীকী, সাধারণ সম্পাদক সবদুল হোসেন খাঁন, যুবমৈত্রীর সভাপতি অনুপ কুমার পিন্টু, জেলা জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইউনুস তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক শামীম বিশ্বাস, জেলা ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শ্যামল শর্মা, সাধারণ সম্পাদক অরূপ মৈত্র প্রমুখ।

মন্তব্য
Loading...