কাঁস্তে হাতে আবারো চাষিদের পাশে যশোরের সংস্কৃতিকর্মীরা

0 ২৩

প্রণব দাস

যশোরের সংস্কৃতিকর্মীরা আবারো কাঁস্তে হাতে নেমে পড়লেন ধানক্ষেতে। করোনাকালে সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতায় স্বেচ্ছাশ্রমে তারা কেটে দিলেন প্রান্তিক চাষিদের জমির পাকা ধান।

বৈশি^ক মহামারি করোনাভাইরাসের করালগ্রাসে আক্রান্ত গোটা পৃথিবী। করোনার ছোবল থেকে বাঁচতে সরকারের নির্দেশনায় চলছে কঠোর বিধিনিষেধ। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই কাজ কমে যাওয়ায় অর্থ সংকটে আছেন প্রান্তিক চাষিরা। আবার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত করতে না পারায় শ্রমিক সংকট রয়েছে। এদিকে মাঠের সোনার ধান সময়মতো কাটতে না পেরে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন প্রান্তিক বর্গাচাষিরা।

তাই এসব অসহায় কৃষকদের কথা মাথায় রেখে গতবারের ন্যায় এ বছরও সংস্কৃতিকর্মীরা কাঁস্তে হাতে মাঠে নেমেছেন ধান কাটতে। সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতায় সংস্কৃতিকর্মীদের এহেন উদ্যোগে মুখে হাসি ফুটেছে যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণবাটি গ্রামের সাইদুর রহমানের। দুশ্চিন্তার বলিরেখা দূর হয়েছে বি (বহ্মপুত্র) পতেঙ্গালী গ্রামের বর্গাচাষি ইমরান হোসেন, পঙ্কজ বিশ^াস, কালাম গাজী, আনসার আলী ও ফারুক গাজীর।

যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে শুক্রবার সকালে স্বেচ্ছাশ্রমে এই ছয় প্রান্তিক চাষির জমির ধান কেটে দেন ৩৫টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। তাদের এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুকুমার দাস বলেন, আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা মাঠের মানুষ। মাঠে মঞ্চ তৈরি করে আমরা গান করি, নাটক করি। সে মঞ্চে আমরা সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলি। আমাদের সংস্কৃতিচর্চাসহ সব কর্মকা- মানুষের জন্যই।

তিনি বলেন, ছোট ছোট ক্ষেতে যারা সোনার ফসল ফলিয়েছেন বর্তমানে করোনাকালে তাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এমন অবস্থার খবর পেয়ে এদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। আমরা যতটুকু পারি এদের সহায়তা করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, আমাদের এ কর্মসূচিতে ১৮ বছরের তরুণের পাশাপাশি ষাটোর্ধ্বরাও রয়েছেন। কারণ আমরা মানুষের সাথে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আমরা আমৃত্যু মানুষের পাশে থাকতে চাই।

যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তরিকুল ইসলাম তারু বলেন, ধান কেটে ঘরে উঠাবে; কিন্তু চলমান লকডাউনের কারণে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। আবার অর্থনৈতিক দুরবস্থায়ও আছেন অনেক প্রান্তিক চাষিরা।

তিনি বলেন, মাটি ও মানুষের সাথে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের দায়বদ্ধতায় আমরা অসহায় ও প্রান্তিক কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। তাদের যতটুকু পারবো আমরা সহায়তা করে যাব। কৃষক যদি সময়মতো মাঠের ধান ঘরে তুলতে না পারেন তবে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে যাবে।

সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বৈশিক মহামারি করোনার প্রভাবে শ্রমিক সংকট তারপর কর্মসংস্থান না থাকায় আয়হীন হয়ে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র বর্গাচাষিরা। এদিকে ধান পেকে মাঠে নষ্ট হওয়ার উপক্রম। তাই সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতায় আমরা করোনা মহামারির এ ক্রান্তিকালে আমাদের অন্নের যোগানদাতা কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছি। গতবছর আমরা ১২ দিনব্যাপী যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের ধান কেটে দিয়েছিলাম। শুক্রবার থেকে যশোরের সংস্কৃতিকর্মীরা এ কর্মযজ্ঞ আবার শুরু করেছেন। মাঠে ধান থাকা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এ কর্মযজ্ঞ।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি প্রতিটা মানুষের মাটির সাথে একটা সম্পর্ক থাকা উচিত। আর সংস্কৃতিকর্মীদের তো অবশ্যই থাকা উচিত। কারণ মানুষকে নিয়েই সংস্কৃতি। সেকারণে সংস্কৃতিকর্মীদের তার শেকড়ের সাথে পরিচয় হওয়াটাও জরুরি। এ কর্মযজ্ঞ অনেকের জন্য শিক্ষণীয়ও।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখার সভাপতি হারুন আর রশিদ বলেন, করোনার প্রভাবে মানুষ ঘরবন্দি। এ অবস্থায় কৃষকের ধান পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটে মাঠ থেকে ধান ঘরে নিতে পারছেন না কৃষকরা। ইতোমধ্যে কৃষকদের ধান ঘরে তুলে দিতে কাজ শুরু করেছেন বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। তারই ধারাবাহিকতায় যশোরে প্রান্তিক চাষিদের ধান কেটে দিচ্ছেন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

তিনি আরো বলেন, আমরা দেশের ক্রান্তিকালে সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব।
উপকারভোগী কৃষক কৃষ্ণবাটি গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, এই লকডাউনে জন (শ্রমিক) দিয়ে কাজ করাতে টাকা লাগতো। লকডাউনের কারণে কর্মস্থল বন্ধ তাই কাছে টাকাও নেই। এমন বিপদের সময় এই মানুষগুলো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমার মায়ের অনুরোধে তারা আমার প্রায় ১০ কাঠা জমির ধান কেটে দিয়েছেন। এতে অনেক উপকার হলো; আমরা খুব খুশি।

যশোর জেলা সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে ধান কাটা কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রথম দিনে যশোর সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের বর্গাচাষি ইমরান হোসেনের ২৫ কাঠা, পঙ্কজ বিশ্বাসের নিজের জমির ৮ কাঠা, কালাম গাজীর ১২ কাঠা, আনসার আলীর ৬ কাঠা, ফারক গাজীর ৮ কাঠা এবং কৃষ্ণবাটি গ্রামের সাইদুর রহমানের ১০ কাঠা ধান কেটে দেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

এ কার্যক্রমে অংশ নেন যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তরিকুল ইসলাম তারু, সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসভাপতি সুকুমার দাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাহামুদ হাসান বুলু, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখার সভাপতি হারুণ অর রশিদ, দপ্তর সম্পাদক প্রণব দাস, প্রথম আলো বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি মোয়াজ্জেম হেসেন মঞ্জু, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার প্রদীপ দাস, বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল, সাধারণ সম্পাদক দীপংকর বিশ^াস, মানস বিশ^াস, ভগিরথ পাল, তন্ময় বিশ^াস, মোহন মল্লিক, জয় আচার্য্য, উদীচী যশোরের কাজী শাহেদ নওয়াজ, রিয়াদুর রহমান, জেলা ছাত্র মৈত্রির সভাপতি শ্যামল শর্মা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (তৃতীয় মত) যুগ্মসমন্বয়ক খবির সিকদার, পুনশ্চ যশোরের সজিব পাল, আশুতোষ পাল, অমিত রায়, বাউলিয়া সংঘের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ বাউল, মকবুল বাউল, মজিদ বাউল, শাজাহান বাউল, সিদ্দিক বাউল, শেকড় যশোরের রুবেল হোসেন, স্পন্দনের শরিফুল ইসলাম, সপ্তসুরের রফিকুল ইসলাম, চাঁদের হাটের আমিন বাবু, চারুতীর্থের সজল ব্যানার্জী, নন্দন যশোরের সাধারণ সম্পাদক ডিএইচ দিলসান প্রমুখ।

মন্তব্য
Loading...