আবদ্ধ জায়গায় ঈদজামাত করোনা প্রতিরোধে কতটুকু কার্যকর

0 ৭১

সাইফুর রহমান সাইফ

বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ এখন এক চরম সংকটে। এসএআরএস- কোভিড-২ বা করোনাভাইরাসের হানায় ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে মানবসভ্যতা। ভারতের পথে পথে চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে মানুষ। আলাদাভাবে সুযোগ না থাকায় গণসৎকার করা হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদীর ভাষায় ঝড় এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিয়ে গেছে।

সারাবিশ্বের যখন এ পরিস্থিতি তখন আমাদের এ প্রিয়ভূমি বাংলাদেশও বাইরে নেই কোভিড-১৯ এর আগ্রাসী থাবার। এখানে হররোজ মরছে মানুষ। চিকিৎসার জন্যে রোগী নিয়ে এখান থেকে ওখানে ছোটাছুটি করছে তাদের আত্মীয়স্বজন। এক সময় বুকের পাজর ভেঙে নিকটজন চলে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার ওপারে।

এ রকম এক নাকাল সময়ে জীবন বাঁচিয়ে রাখতে সবরকার নিয়েছে কিছু পদক্ষেপ। এর অংশ হিসেবে চলাচল আটকে দেয়া হয়েছে। জীবনযাত্রায় আরো বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আগামী ঈদের জামাত খোলা ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় আদায়ে না করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে মসজিদে পড়তে। আর নামাজের সময়ে সাথে করে জায়নামাজ নিয়ে যেতে হবে।

বলার দরকার পড়ে না মসজিদ আবদ্ধ জায়গা। সভ্যতার সুযোগ কাজে লাগাতে শহুরে মসজিদের অধিকাংশে আবহাওয়া শীতলযন্ত্র বা এসি বসানো হয়েছে। দু-একটা বাদে সব মসজিদে বসেছে এ যন্ত্র। এ যন্ত্র জামাতের সময় ছেড়ে দেয়া হয়। আর অনেক মানুষের ভেতর শীতল হাওয়া ছড়িয়ে দিতে বৈদ্যুতিক পাখা দেয়া হয় চালিয়ে।
সরকারি নির্দেশনায় এ ব্যবস্থার সাথে দ্বিমত দেখানো হয়নি বলে প্রতীয়মান। দ্বিমত দেখানো হয়েছে খোলা জায়গায় ঈদের জামাত আদায়ে। অথচ চলতি সময়ে করোনা সংক্রমণ এড়াতে খোলামেলা পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসরাইলসহ বিশ্বের নানা দেশে খোলা জায়গার চেয়ে আবদ্ধ জায়গা বা ঘরের ভেতর মাস্ক পরার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নিশ্বাসের সাথে ড্রপলেট বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে ফোঁটা বের হয় তা থেকে সংক্রমিত হয় করোনাভাইরাস। ড্রপলেট যিনি ছাড়লেন তিনি যদি আগে থেকে সংক্রমিত হয়ে থাকেন। এ ফোঁটার সংস্পর্শে এসে মানুষ করোনাভাইরাসে অক্রান্ত হয়। এসব ফোঁটা কিছুক্ষণ বাতাসে থেকে তা নিচে পড়ে যায়। সে ফোঁটা হাতে স্পর্শের পর তা চোখ, মুখ বা নাকের মাধ্যমে শরীরে ঢোকে। তাই বার বার হাত ধোয়ার কথা বলা হয়েছে।

একটি গবেষণা উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকি মেডিকেল নিউজ টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসএআরএস-কোভি-২ বাতাসে অ্যারোসল বা কুয়াশা যে আকারে থাকে সে আকারে তিন ঘণ্টা টিকে থাকে। তবে তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার প্রভাবে তা কমবেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা জায়গার চেয়ে আবদ্ধ জায়গায় করোনাভাইরাস বেশি ছড়ায়। এ সংস্থাকে উদ্ধৃত করে বিবিসির আন্তর্জাতিক সংস্করণে একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছে।

বিবিসির বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক ডেভিড শুকম্যানের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাইরেও করোনার সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সে সম্ভাবনা খুবই কম। যদি সেখানে মুক্ত বায়ু থাকে। মুক্ত বাতাসে ভাইরাস ভেসে যায়। এছাড়া সূর্যের তাপে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়না।

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এমন বেশকিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে যেখানে মুক্ত বাতাসে করোনার অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাস কিভাবে ছড়ায় তাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আক্রান্ত কোন ব্যক্তি হাতের ভেতর কাশি দেয়ার পর সে হাত কোথাও স্পর্শ করলে সেখানে কয়েক ঘণ্টা ভাইরাস বেঁচে থাকে। এবং তা অন্য কেউ স্পর্শ করলে তিনি সংক্রমিত হন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা সংক্রমণ এড়াতে কমপক্ষে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
কথা হচ্ছিল ঈদ জামাত নিয়ে। এ জামাতের জন্যে মসজিদ, না ঈদগাহ কম ঝুঁকিপূর্ণ সেটিই দেখার বিষয়। মসজিদ নিয়ে আগে আলোচনা হয়েছে। অন্যান্য ঘরের মতো মসজিদও আবদ্ধ জায়গা। আর শহুরে মসজিদ হলে তো কথা নেই! এসব মসজিদে এসির ব্যবহারের কথা আমাদের জানা। এ ক্ষেত্রে সত্যিকারের গ্রামের মসজিদ অনেকটাই খোলামেলা।

আমরা গবেষণা থেকে জেনেছি, ভাইরাস সংক্রমণে আবদ্ধ জায়গা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মসজিদও এ শ্রেণির। আর গরম বাতাসকে যন্ত্রের সাহয্যে শীতল করা মসজিদে এ আশংকা আরো বেশি। এখানে ড্রপলেটের অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো নির্বিঘেœ অনেকক্ষণ টিকে থাকতে পারে। আর তা যদি হয় করোনাভাইরাস সমৃদ্ধ তবে বুঝুন ব্যাপারটা! একে কম ঝুঁকিতে আনতে হলে দরোজা-জানালা খুলে দিয়ে বাতাসের আনাগোনা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাইরাসনাশক ব্যরহার করতে হবে। আর মাস্ক ব্যবহারের কথা না-ই বা বললাম। ভাইরাসনাশক ব্যবহারের পর চুরি করে কোথাও ড্রপলেট থেকে গেলে মাস্ক তা থেকে সুরক্ষা দেবে। সংক্রমিত কেউ হাঁচি-কাশি দিলেও। আর বাড়ি থেকে জায়নামাজ নিয়ে গেলে লুকিয়ে থাকা ড্রপলেট তালে লেগে তা বাড়িতে চলে আসবে। ভালকরে ধুয়ে না ফেললে তা বাড়ির সবাইকে সংক্রমিত করবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদে জায়নামাজ নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে মসজিদ জীবানুমুক্ত করাকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ।

ঈদজামাতে অনেক লোকের সমাগম হয়। ঈদগাহ খোলা জায়গা হওয়ায় কোভিডবাহী কণাগুলো খুববেশি সুবিধা করতে পারবে না। মসজিদ হলে যতটা সহজ হবে, ততটা না। এখন অধিকাংশ স্থানে ঈদের জামাতের জায়গায় ত্রিপল বা পলিথিন বিছিয়ে দেয়া হয়। এ পলিথিন ভালভাবে ব্লিচিং পাওডার বা অন্য জীবানুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করে নিলে কোভিড ছড়ানোর আশংকা কম থাকবে। এ সময় অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও মানতে হবে। তাহলে ঈদজামাত গেল কুম্ভমেলার মতো অনিরাপদ হবেনা বলে আশা করা যায়।

মন্তব্য
Loading...