টানা তাপদাহে কাহিল প্রণিকূল

বৈশাখে চলছে আষাঢ়ের তালপাকা গরম! টানা এমন তাপমাত্রা নজিরবিহীন

0 ৮০

প্রণব দাস

তপ্ত রোদে অতীষ্ঠ জীবন। যেন রোদে পুড়ছে দেশ। মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বইছে যশোরসহ প্রায় সবগুলো জেলার ওপর দিয়ে। এই অবস্থায় বৃষ্টির কোনও সুখবর নেই আবহাওয়া অধিদফতরের কাছে।

বৈশাখ মাসে যশোরে টানা আষাঢ়ের ‘তালপাকা’ দাবদাহ বইছে। প্রায় ছয় মাস বৃষ্টির দেখা নেই। যেকারণে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়ছে তীব্র তাপদাহ। পরিবেশবিদরা বলছেন, ভৌগোলিক কারণের পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত বৃক্ষনিধন, নদী শাসন, পুকুর ভরাটে এ অঞ্চল দিন দিন চরমভাবাপন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে হতাশাজনকভাবে।

গত এক সপ্তাহ ধরে যশোর অঞ্চলে গড়ে তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। এরমধ্যে ২৫ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত সাত দিনের মধ্যে মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) যশোরে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম ছিল। এদিন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা আর্দ্রতার কারণে অনুভব হয় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন দাবদাহ আরও সপ্তাহব্যাপী চলবে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, একই অঞ্চলে একটানা এমন তাপদাহ নজিরবিহীন বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তারা বলছেন শিগগির ভারি বৃষ্টি না হলে এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব পড়বে। গত ছয় মাস ধরে যশোর ও তার আশপাশের এলাকায় এখনো পর্যন্ত ভারি বৃষ্টি হয়নি। মাঝেমধ্যে ছিঁটেফোঁটা বৃষ্টি হলেও তা কাজে আসছে না।

গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র তাপদাহ প্রসঙ্গে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের সাবেক উপাধ্যক্ষ প্রফেসর অশোকা দত্ত বলেন, মূলত যশোর অঞ্চল কর্কটক্রান্তি রেখার কাছাকাছি হওয়ায় এমন অবস্থা। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো শীত-গ্রীষ্ম মৌসুমে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন আচরণ করে। তবে এবছর একটানা এমন তাপমাত্রা নজিরবিহীন।

তিনি বলেন, এ অঞ্চলে বেশি বেশি জলাধার সৃষ্টি অর্থাৎ নদী-খালগুলোকে জীবিত করতে না পারলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের।

যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছোলজার হোসেন বলেন, আমাদের দেশে এবছর শীতকাল আকস্মিকভাবে লম্বা হয়েছে। এছাড়া অন্যবারের মত এবছরে শীতকালে বৃষ্টি হয়নি। উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও কৃষি এবং গৃহস্থালি কাজে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এছাড়া জলাধারসমূহ ভরাট ও বন্ধ করার ফলে মাটির আর্দ্রতা ঘাটতি, উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, প্রকৃতিগতভাবে আমাদের এই অঞ্চল অর্থাৎ যশোর-চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে ভারতের অংশে প্রায় সারাবছরই একটি নিম্নচাপ বিরাজ করে। এ নিম্নচাপের কারণে এখান থেকে কিছু উষ্ণ বায়ু বাংলাদেশের দিকে প্রভাব ফেলে। ভারত সংলগ্ন পশ্চিম ও উত্তর এলাকাতে একটা দীর্ঘমেয়াদি নি¤œচাপ বিরাজ করে। যেকারণে যশোরসহ এই কয়টি জেলায় শীত মৌসুমে তাপমাত্রা হ্রাস এবং গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া আরও একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে দক্ষিণের সুন্দরবন। এ বৃহৎ বনের আড়ালের কারণে আমাদের এ অঞ্চল উন্মুক্ত অর্থাৎ বৃক্ষ আচ্ছাদনমুক্ত। আবার ভৌগলিকভাবে আমাদের এ অঞ্চল কর্কটক্রান্তি রেখার আশেপাশে অবস্থিত হওয়ায় সূর্যরশ্মি বাধাহীন আগমন এখানকার ভূমিকে উত্তপ্ত করে। আবার মৃত্তিকার ধরন কঠিন প্রকৃতি হওয়ায় তাপমাত্রা হ্রাস পায় খুব ধীরগতিতে।

তিনি বলেন, যশোরের পশ্চিমাংশের মৃত্তিকা শক্তপ্রকৃতির। ফলে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা শোষণ ও তাপমাত্রা ধরে রাখার স্থায়িত্ব দুটোই বেশি। এসব সার্বিক কারণে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা বেশিরভাগ সময়ই স্বাভাবিক থেকে বেশি থাকে। তিনি আরো বলেন, এসব কারণের পাশাপাশি আমরা তুলনামূলকভাবে শিল্পের দিকে এগোচ্ছি, অকৃষি কর্মকা- করছি, গাছপালা নিধনের পাশাপাশি নদী ও-খাল ধ্বংস করছি; পুকুর ভরাট করছি। এসব কারণে পরিবেশ প্রতিবেশে বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় জলাশয় বৃদ্ধি এবং মৃত্তিকায় হিউমাস বা জৈবপদার্থ বৃদ্ধি করা। তা না হলে আগামীতে এ পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করবে বলে এ পরিবেশবিদ মনে করেন।

মন্তব্য
Loading...