পৌর প্রশাসনকে গণমুখী করতে চান মেয়র পলাশ

৯০ কোটি ১৮ লাখ টাকা দেনা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ

0 ১৯৬

বীরমুক্তিযোদ্ধা হায়দার গনী খান পলাশ। যার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যশোর শহরেই। দেশের অন্যতম বৃহত্তর পৌরসভার মেয়র হিসেবে ১৩ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি যশোর পৌরসভাকে গণমুখী করার কাজ শুরু করেছেন। প্রতিদিনের কথা’য় একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন- চেরাগের গোড়ায় অন্ধকার; দীর্ঘদিন ধরে জমে যাওয়া সে অন্ধকার দূর করা দুষ্কর। তারপরেও সেই দুষ্করকর্মই পৌরবাসীকে সাথে নিয়ে দূর করে আলো জ¦ালাতে চাই। শুক্রবার শহরের পিলু খান সড়কস্থ তার বাসভবনে সাক্ষাৎকারটি নেন আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক প্রণব দাস।

সকলের কাছে সময় চেয়ে তিনি বলেন- নির্বাচিত হওয়ার আগে পৌরবাসীর কাছে আমার প্রতিশ্রুতি ছিল- যশোর পৌরসভার দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেই প্রতিশ্রতি রক্ষায় আমি বদ্ধ পরিকর। সাধারণ মানুষের ভালবাসায় নির্বাচিত মেয়র হিসেবে পৌরসভার উন্নয়নে এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে আমি দায়বদ্ধ। তাই যেকোন প্রয়োজনে এবং পরামর্শ দিতে আমার সাথে সরাসরি কথা বলতে আপনাদের কোন বাধা নেই। আপনাদের কথা জানানোর জন্য কোন মাধ্যম লাগবে না। কোন কাজের জন্য কোন মাধ্যম দিয়ে সুপারিশ করা লাগবে না। এলক্ষ্যে পৌর প্রশাসনকে গণমুখী করার কাজ শুরু করেছি। কিন্তু চেরাগের গোড়ায় অন্ধকার; দীর্ঘদিন ধরে জমে যাওয়া সে অন্ধকার দূর করা দুষ্কর। পৌরবাসীকে সাথে নিয়ে সেই দুষ্করকর্মই দূর করে আলো জ¦ালবো। সবে শুরু করলাম; সকলের কাছে একটু সময় চাই। প্রতিটা ওয়ার্ডে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে যা খুব শিঘ্রই দৃশ্যমান হবে। যে দৃশ্যমানতায় যশোর পৌরসভা দেশের মধ্যে অন্যতম আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত পৌরসভা হিসেবে পরিগণিত হবে।

পৌরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে কাজ শুরু করেছি বলে বীরমুক্তিযোদ্ধা হায়দার গনী খান পলাশ বলেন- মেয়রের কাছে পৌরবাসীর প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশা পূরণে কাজ শুরু করেছি। নাগরিক সেবা প্রদানে সমস্যা চিহ্নিত করে সে সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু ৯০ কোটি ১৮ লাখ আট হাজার ৬৩৪ টাকা দেনা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ বিপুল পরিমাণ দায়দেনার মধ্যে বিদ্যুৎ বিল রয়েছে ২৩ কোটি ১৭ লাখ তিন হাজার ৩৫৪ টাকা। এ পরিমান বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে ২০১৬ সালের আগের বিভিন্ন মেয়াদের বকেয়া রয়েছে ১৭ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৩ টাকা। পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বকেয়া রয়েছে তিন কোটি ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার ৫১২ টাকা। যার মধ্যে গত পাঁচ বছরের বকেয়া বেতনের পরিমাণ এক কোটি ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৯ টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচ্যুইটি নিয়মিত বকেয়া ২১ কোটি ৩৬ লাখ আট হাজার ৪৮০ টাকা, অবসর ভাতা (প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচ্যুইটি) বাবদ বকেয়া রয়েছে আট কোটি ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ৪১৮ টাকা। জ¦ালানী তেল বাবদ বকেয়া ৭১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯৫ টাকা। ঠিকাদারী বিল বাবদ বকেয়া তিন কোটি ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৮ টাকা; যার মধ্যে ২০১৬ সালের আগের বকেয়া দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা। ঠিকাদারী জামানত হিসেবে বকেয়া ৬২ লাখ দুই হাজার ৯৬৬ টাকা। এডিবি মাঝারি শহর পানি প্রকল্পের ২০১৬ সালের লোন বাবদ বকেয়া ২০ কোটি টাকা। খাজনা বাবদ বকেয়া দুই কোটি ৭৬ লাখ আট হাজার ৫৩১ টাকা, ইজিআইআইপি-৩ প্রকল্পে পৌর হেরিটেজ মার্কেট নির্মাণ এবং পানির লাইন তৈরিতে লোন বাবদ পাঁচ কোটি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা, বিবিধ বিল বাবাদ বকেয়া ৩০ লাখ; যার মধ্যে ২০১৬ সালের আগে বকেয়া রয়েছে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া সিডিএফ প্রকল্পে ২০১৬ সালের আগে বকেয়া রয়েছে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

দেনামুক্ত সুন্দর ও স্বচ্ছ যশোর পৌরসভা গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছি বলে তিনি জানান, পাঁচ বছরের জন্য জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছেন। পাঁচ বছর সময়টা খুব বেশি না; আবার কমও না। এ সময়ের মধ্যেই উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি দায় দেনামুক্ত সুন্দর ও স্বচ্ছ যশোর পৌরসভা গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সকলের সহায়তা চান তিনি।

প্রসঙ্গত, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নানাভাবে পরিবর্তন হলেও বিপথগামী না হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে ত্যাগী নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার গনী খান পলাশ। তিনি পড়াশোনা করেছেন যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন এবং মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হয়ে তৎকালিন যশোর মহাকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬৯ এ ১১দফা আন্দোলনে অংশ নেন। পরে ১৯৭১ এ ভারতের দেরাদুন থেকে স্বশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে অংশ নেন মাহান মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পরে লেখাপড়ায় মনোযোগী হন তিনি। এই সময়ে নির্বাচিত হন কলেজ ছাত্র সংসদের প্রোভিপি। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে শাহাদৎ বরণ করলে ভারতে চলে যান। সেখানে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, প্রয়াত মো. নাসিম, আব্দুর রহমানদের সাথে মিলিত হন। সেখানে কামলা খেটে নিজেদের খাবার যোগাতে হতো। একপর্যায়ে সেদেশের রাজনীতির পরিস্থিতির কারণে নিজ দেশে ফিরে আসেন। এসময় সামরিক জান্তার হাতে গ্রেফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতন সইতে হয় তাকে।

পরে মুক্তি পেয়ে যশোরে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে ভুমিকা রাখেন তিনি। এছাড়া স্বৈরাচার ও বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যশোর ঈদগাহে সর্বশেষ কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষিত যশোর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে তাকে সহসভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এর আগের কমিটিতে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন।

মন্তব্য
Loading...