মহান মুক্তিযুদ্ধকালে আজ যশোরে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন চারুবালা

৩৫

প্রণব দাস

১৯৭১ সালের তিন মার্চ যশোরবাসীর জন্য এক ঐতিহাসিক ও কষ্টের দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এদিন যশোরে পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন চারুবালা কর।

সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা। স্বতঃস্ফূর্ত উত্তাল পরাধীনতার শিকল ভাঙার মুক্তিপাগল জনতার বিশাল মিছিল বের হয় যশোরের ঈদগাহ ময়দান থেকে। দড়াটানা মোড় ঘুরে কাপুড়িয়াপট্টি-চৌরাস্তা হয়ে মিছিলটি ঢোকে রেল রোডে।

সরকারি খাদ্যগুদামের সামনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থান দেখে তাদের দিকে ইট ও জুতা নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। ওই সময় এক পাকসেনা বিক্ষুব্ধ জনতাকে ভয় দেখাতে ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে, গুলিবিদ্ধ হয় আকাশে উড়ে বেড়ানো এক চিল। মৃত চিলটিকে নিয়ে মিছিলটি ঢোকে ভোলা ট্যাঙ্ক সড়কে। সার্কিট হাউসের ভেতরে পাকিস্তানি সেনাদের দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। তারা সার্কিট হাউস আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক শহীদ মশিয়ুর রহমান বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে যান ঈদগাহ ময়দানে। বিভিন্ন মহল্লা থেকে বিক্ষুব্ধ মানুষ তখনও জড়ো হচ্ছিল সেখানে।

দুপুর ১২টার দিকে হানাদারবাহিনীর গাড়ি ঈদগাহের পাশের রাস্তা অতিক্রম করার সময় জনতা আবারও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। জনতার দিকে অস্ত্র তাক করে পাকিস্তানি সেনারা। নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে শান্ত হয় উত্তাল জনতা। ওই সময় খবর আসে টেলিফোন ভবন দখল করে নিয়েছে পাকহানাদারবাহিনী। চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে, উত্তেজিত ছাত্র-জনতার একটি অংশ ঈদগাহ ময়দান থেকে বেরিয়ে টেলিফোন ভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় কোন পূর্ব সতর্কীকরণ ছাড়াই টেলিফোন ভবনের ছাদ থেকে জনতার দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করে হানাদারবাহিনী। টেলিফোন ভবনের পশ্চিম পাশে বসবাস করতেন নিঃসন্তান পূর্ণ চন্দ্র কর ও তার স্ত্রী চারুবালা কর। হানাদার বাহিনীর ছোঁড়া বুলেট ঘরের গোলপাতার ছাউনি ভেদ করে বিদ্ধ হয় চারুবালা করের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গেই শহীদ হন তিনি।

চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে রাখা হয় যশোর সদর হাসপাতাল মর্গে। মর্গে তালা লাগিয়ে পাকসেনারা অবস্থান নেয় সেখানে। বাইরে হাজার হাজার মানুষ চারুবালা করের মরদেহ নেয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু পাকসেনারা মরদেহ দিতে নারাজ। অপেক্ষমাণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে। ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে মানুষ। এমন সময় মশিয়ুর রহমান মুখোমুখি হন পাকসেনা অফিসারদের। বজ্রকণ্ঠে তিনি তাদের বলেন, ‘আমার মায়ের মরদেহ আমি নিয়ে যাব, তোমরা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’ মুহূর্তে জনতা মর্গের তালা ভেঙে বাইরে নিয়ে আসে চারুবালা করের মরদেহ, সূর্য তখন অস্তগামী, সৎকারের জন্য শহীদ চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটছে নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে, শবযাত্রায় পুরুষের সঙ্গে যোগ দেয় বহু নারী। সবার চোখে মুখে প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে সমাধিস্থ করা হয় শহীদ চারুবালা করের মরদেহ।

সরেজমিন দেখা গেছে, নীলগঞ্জ মহাশ্মশানের পাশে নদীর ধারে প্রগতী বালিকা বিদ্যালয়ের পেছনে মাটির সাথে মিশে আছে চারুবালা করের সমাধি; যার উপর দিয়ে বাড়ি তুলেছেন নীলগঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দা। এক পাশে শুধু এক লাইন ইটের সারি ছাড়া আর কিছুই নাই সেখানে। শেষ চিহ্নটুকুও আর নেই সেখানে।

এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, চারুবালার মৃত্যু ছিল যশোরের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিশোধ নেয়ার এক অনুপ্রেরণা। যা পরবর্তীতে মুক্তিকামী যশোরবাসীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতর্কিত গুলিতে নিহত চারুবালা করের মৃত্যু মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তার মৃত্যুর পর যশোর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই দিনটির কথা আজ আর সেইভাবে কেউ মনে রাখেনি।

তিনি বলেন, তার মৃত্যুবার্ষিকী যশোরের কোন সংগঠন তেমনভাবে কেউ পালন করে না। যা খুবই হতাশার। চারুবালা করের সমাধিস্থল উদ্ধার করে ‘চারুবালা কর স্মৃতিফলক’ নির্মাণের দাবি জানান আফজাল হোসেন দোদুল। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে চারুবালা করের সমাধি সংরক্ষণের দাবি জানান।

এদিকে সাংস্কৃতিক সংগঠন তির্যক যশোরের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, যশোরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রথম শহীদ চারুবালা কর আজও একটি অজানা ইতিহাস। কখনো পালন করা হয় না তার মৃত্যু দিবস। তবে আজ (বুধবার) বিকেল চারটায় তির্যক যশোরের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো চারুবালা করের স্মরণ দিবস পালিত হবে। যশোর পৌর উদ্যানে তির্যক যশোরের চারুবালা ভবনের সামনে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে এই মহান শহীদের স্মরণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখা আজ সকাল ৯টায় নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সকলকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখার সভাপতি হারুণ অর রশিদ।

মন্তব্য
Loading...