চোর ধরতে শিক্ষিত সমাজের অশিক্ষিত আচরণ

২৬

আমরা কোথায় চলেছি। একদল শিক্ষিত মানুষ তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে চাল পড়া খাইয়ে চোর ধরার অপচেষ্টা করেছেন। বিষয়টি শতভাগ হাস্যকর হলেও এর প্রতিক্রিয়ায় একটি জীবন হারিয়ে যেতে পারতো। স্বজনদের সতর্কতার জন্য জীবনটি রক্ষা পেলেও সামাজিকভাবে তার যে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে তার জন্য তিনি মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের মানুষের পশ্চাদপদতা ও কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ দেখে একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার একটি চরণ হলো ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখন বসে. বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি কোরআন হাদিস চষে।’ কবির সময়কাল থেকে বহু বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা সেই অবস্থা থেকে এখনও সরে আসতে পারিনি। শৈশবে শোনা যেত সাপে কাটা রোগী ঝাঁড়ফুক করে বাঁচানো যায়। এমনই একটি কল্পিত কাহিনী নির্ভর ‘জরিনা’ নামে একটি কবিতা ওই সময় এত জনপ্রিয় ছিল যে ফোল্ডার করা ৮ পৃষ্ঠার ওই কবিতাটি গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পাওয়া যেত। যারাই বাজার ঘাটে যেত তারাই একটা কিনে আনত। যারা পারত তারা সুর করে পড়ত এবং তাকে ঘিরে নারী-পুরুষ মনযোগ সহকারে শুনত সেই কবিতাটি। কবিতার মূল কথা ছিল বেদের মেয়ে জরিনা ও তার দাদী ঝাড়ফুক করে জমিদারের সাপে কাটা মৃত ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। পরে সাপুড়ে জরিনার সাথে জমিদারের ছেলের বিয়েও হয়।

এ সব কল্প কাহিনী আজো সমাজে চালু আছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় এমন ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। সরাপপুর ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৮ হাজার টাকা শিক্ষক কমনরুম থেকে হারিয়ে যায়। কেউ এই টাকা নেয়ার কথা স্বীকার না করায় শিক্ষকদের সবাই একমত হয়ে এক মসজিদের ইমামের কাছ থেকে চাল পড়ে এনে সবাইকে খায়ানো হয়। এতে নাকি এক শিক্ষিকা ওই টাকা নিয়েছেন বলে ধরা পড়েছেন। এ দিকে ওই শিক্ষিকা টাকা হারানোর সময় কমনরুমে ছিলেন না। তিনি এই অপবাদের কারণে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্বজনরা তাকে নিবৃত করেছেন। তিনি এখন লোক লজ্জার কারণে স্কুলে যেতে পারছেন না।

দিন পাল্টেছে। কবি সুফিয়া কামাল বাস্তবতার সাথে মিল করে কবিতা লিখেছেন ‘আমরা যখন আকাশের তলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি, তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।’ এটাই বাস্তবতা। যে সময় আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না তখন মানুষ সান্ত ¦না পেতে অনেক কিছু করতো। কিন্তু এখন সে দিন আর নেই। আগেকার দিন হলে হয়তো ওই শিক্ষিকাকে টাকা পরিশোধ করতে হতো। জ্ঞান-বিজ্ঞনের উৎকর্ষতার দিনেও যে আজ এক শ্রেণির মানুষ সেই আদি কালের ধ্যান-ধারণা নিয়ে আছে এটাই বিষ্ময়কর। আরো বিস্ময়করা চাল পড়া খাওয়ানোর এই কাজটি করেছেন শিক্ষিতরা। তারা কোন জগতে বাস করেন এটাই আজ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কবি গুরু লিখেছিলেন, ‘হে বঙ্গ জননী, সাত কোটি সন্তানকে রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি।’ আসলে জাতি হিসেবে বাঙালি এক হুজুগে জাতি। নতুবা এক রাতে সারা দেশের মানুষ কঞ্চির পানি খায় কি করে? কে হুজুগ তুলে দিল কঞ্চির পানি খেলে রোগ-ব্যাধি সেরে যাবে। আর অমনি এই পানি খেল সবাই। ভাবতেও অবাক লাগে মুখে মুখে সারা দেশে এ কথাটি ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ একবার ভেবেও দেখল না, আসলে কি কথাটা সত্য।
জাতি হিসেবে আমাদেরকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হলে কুসংস্কারমুক্ত হতে হবে, হতে হবে বাস্তববাদী। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে সবাইকে প্রযুক্তিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে কেউ এগোতে পারবে না।

মন্তব্য
Loading...