ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও যশোরের আন্দোলন

৪২

সাজেদ রহমান

আজ ১৯ জানুয়ারি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।
ওই বছরই যশোরে তার কমিটি গঠিত হয়। যশোরে এই কমিটির প্রথম সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট ইউনুস এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মারুফ হোসেন খোকন। কমিটি গঠনের যশোর টাউন হল ময়দানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালের ২৪ এপ্রিলের সেই জনসভায় এসেছিলেন জাহানারা ইমাম, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, হাসান ইমাম, কাজী আরেফ আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট খান টিপু সুলতান, মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি, মুক্তিযোদ্ধা এজেডএম ফিরোজসহ আরও অনেকে। এই জনসভার পর যশোরে যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়। প্রাণ শক্তি ফিরে পায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি।
এরপর যশোরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ যশোরের বিভিন্ন স্থানে গণকবর, বধ্যভূমি গুলো চিহিৃতের কাজ করেন। যার ফলে যশোরের অনেক গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের সস্মাননাসহ নানা কাজ করেন।
পরে ১৯৯৮ সালে যশোরে নতুন কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি হন অ্যাডভোকেট ইউনুস এবং সাধারণ সম্পাদক হন হারুন অর রশিদ। এসময় বাঘারপাড়ার নারী মুক্তিযোদ্ধা হালিমা, রোকেয়া এবং ফাতেমাসহ ৫জনকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা হয়। এ ব্যাপারে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুনতাসীর মামুন। তাঁদের প্রতিষ্ঠান মুনতাসীর মামুন ফাতেমা ট্রাষ্ট থেকে তাদের এই সহযোগিতা করা হয়। এমনকি ওই নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তখনও পর্যন্ত তালিকায় উঠেছিল না। নির্মূল কমিটি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নাম উঠানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করেন।
এরপর ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় নেতা কাজী মুকুলের উপস্থিতিতে যশোরে হারুন অর রশিদকে সভাপতি এবং অ্যাডভোকেট কাজী ফরিদুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি গঠিত হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হলে ঘাতক দালাল নির্র্মূল কমিটিও কাজ করেন। যশোরের বাঘারপাড়ার প্রেমচারার আমজাদ রাজকারের নামে মামলার সহযোগিতা করা থেকে আমজাদ রাজাকারের পরিবারের অত্যাচার থেকে মামলার স্বাক্ষীদের সুরক্ষার বিয়য়ে নানা ভাবে সহযোগিতা করেন।
২০১৮ সালে যশোর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় হারুন অর রশিদকে সভাপতি এবং সাজেদ রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে। এই কমিটি বেশ কিছু কাজ করেছে। এরমধ্যে অন্যতম যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের বিদ্যানুরাগী নারী শান্তিলতা ঘোষ (৯০) নিজের সাড়ে সাত বিঘা পৈতৃক জমি দান করেছেন এলাকার দুটো বিদ্যালয়কে। এগুলো হলো অভয়নগরের মাগুরা মাধ্যমিক ও মাগুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়। শেষ বয়সে এসে তাঁর মাথা গোজার ঠাঁই ছিল না। রাস্তার পাশে খুপড়ি ঘরে থাকতেন। অভয়নগরের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা(ভারপ্রাপ্ত) মনদীপ ঘরাই তাঁর মাথা গোজার ব্যবস্থা করেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি শান্তিলতা ঘোষকে যশোর জিলা স্কুলে এনে সংবর্ধনা দেন। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তাঁকে সংবর্ধনা দিয়ে ধন্য মনে করেছেন। কারণ সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা সমাজের জন্য কাজ করেন, কিন্তু পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন না।
এছাড়া বাঘারপাড়ার আমজাদ রাজাকার তার বিরুদ্ধে দেয়া স্বাক্ষীদের বাড়িতে হামলা করলে পাশে দাড়ায় নির্মূল কমিটি। এ ব্যাপারে যশোরে সংবাদ সম্মেলন করেন। মানববন্ধনও হয়েছে। এছাড়া বৃক্ষ রোপণ, করোনাকালীন সময়ে অস্বচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কমিটি। এছাড়াও মৌলবাদী চক্র কর্তৃক কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গলে যশোরে মানববন্ধন করেছে নির্মূল কমিটি। সেটা ছিল কুষ্টিয়ার ঘটনায় যশোরে প্রথমে প্রতিবাদ। এছাড়াও যশোরের সমস্ত সামাজিক আন্দোলনে অন্যান্য সংগঠনের সাথে রাজপথে অতীতে ছিল এবং ভবিষ্যতে থাকবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যশোর।

মন্তব্য
Loading...