মণিরামপুর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

0 ২৯

প্রতীক চৌধুরী

যশোরের মণিরামপুরের ৫৪৯ বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল কালোবাজারির মামলার পলাতক আসামি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক উত্তম কুমার চক্রবর্তী বাচ্চুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। একইসঙ্গে তার মালামাল ক্রোক্রের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর মামলার চার্জশিটের উপর শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ এবং সিনিয়ার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. ইখতিয়ারুল ইসলাম মল্লিক এই আদেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশের বিষয়টি রোববার জানাজানি হয়েছে। প্রায় দেড় মাস পার হলেও জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের মণিরামপুর থানায় পৌঁছায়নি এই গ্রেফতারি পরোয়ানা।
অভিযুক্ত উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চু যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনের এমপি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ভাগনে।
রোববার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে মণিরামপুর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চুর গ্রেফতারি পরোয়ানা সংক্রান্ত কোন আদেশের কপি হাতে আসেনি। আদালত কবে এই আদেশ দিয়েছে সেটিও জানা নেই।
পাবলিক প্রসিকিটর (পিপি) এম ইদ্রিস আলী বলেন, অনেক মামলা দেখতে হয়। ওই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়না হয়েছে কিনা, নথি না দেখে এই মুর্হূতে বলতে পারছি না। আদালতের ডিলিং সেকশন বিষয়টি দেখে।’
গত পহেলা অক্টোবর সরকারি ত্রাণের চাল কালোবাজারির মামলায় ছয়জনের নামে চার্জশিট দেয় ডিবি পুলিশ। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন মণিরামপুরের হাকোবা গ্রামের মৃত সুনীল চক্রবর্তীর ছেলে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান উত্তম কুমার চক্রবর্তী বাচ্চু, জুড়ানপুর গ্রামের একুব্বর মোড়লের ছেলে মো. কুদ্দুস, রবিন দাসের ছেলে জগদীশ দাস, তাহেরপুর গ্রামের মৃত সোলাইমান মোড়লের ছেলে শহিদুল ইসলাম, বিজয়রামপুর গ্রামের মৃত লুৎফর রহমানের ছেলে চালকল মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও খুলনা দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা গ্রামের রতন হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক ফরিদ হাওলাদার। চার্জশিটে অভিযুক্ত ভাইস চেয়ারম্যান উত্তম কুমার চক্রবর্তী বাচ্চুকে চার্জশিটে পলাতক দেখানো হয়।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলাটি সার্বিক তদন্ত, সার্বিক তথ্য প্রমাণে, ঘটনার ধারাবাহিকতায় আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় উত্তম কুমার চক্রবর্তী বাচ্চু (৪৬) ত্রাণের সরকারি চাল অসৎ উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করে মজুদ রেখে অধিক মুনাফার আশায় আসামি জগদীশ দাস (৪২) ও মো. শহিদুল ইসলাম (৪০) সহায়তায় আসামি আবদুল্লাহ আল মামুনের (৩০) কাছে বিক্রি করে নগদ চার লাখ টাকা ও পরবর্তীতে ৮০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। আসামি আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. ফরিদ হাওলাদার (৩৫) ও মো. কুদ্দুস (৩৮) অসৎ পন্থা অবলম্বন করে ত্রাণের সরকারি চাল ক্রয় বিক্রয়ে সার্বিক সহযোগিতা করায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট এর ২৫ (১)/২৫-ডি ধারায় প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। আসামি উত্তম চক্রবর্তী পলাতক থাকায় মামলার জব্দকৃত সরকারি চাল কোথা থেকে কিভাবে আনা হয়েছে, তা উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, আসামি আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মণিরামপুর থানার খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের জড়িত থাকার কথা বলা হলেও সেই সম্পর্কে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় নাই।
এদিকে, গত ২৭ জুন আদালতে স্বীকারোক্তিতে আসামি জগদীশ দাস জানান, গত ৩০ মার্চ উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চু ১৬ টন সরকারি চাল ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ভাই ভাই রাইস মিলের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে। চাল বিক্রির স্থান শহিদুল ইসলাম দেখিয়ে দেন। এরপর ৩ এপ্রিল খুলনার মানিকতলা খাদ্যগুদাম থেকে ৫৫৫ বস্তা চাল ট্রাকে লোড করে মনিরামপুরের উদ্দেশে রওনা হন চালক ফরিদ হাওলাদার। তিনি ৪ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে মনিরামপুর খাদ্য গুদামে পৌঁছান। ওই দিন দুপুরে মণিরামপুর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান ট্রাকচালক ফরিদ হাওলাদারকে ওই চাল বিজয়রামপুরে অবস্থিত আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাই ভাই রাইস মিলে আনলোড করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনা মোতাবেক রাইস মিলে চাল আনলোড করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
গত ৪ এপ্রিল মণিরামপুর থানার এসআই তপন কুমার সিংহ গোপন সংবাদ পেয়ে মণিরামপুর উপজেলার বিজয়রামপুরের ভাইভাই রাইস মিলে সরকারি চাল ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে। তিনি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জনিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মিল মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ট্রাকচালক ফরিদ হাওলাদারকে আটক করেন। এই চাল কাবিখার বলে আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে জানান। এ চালের কোনো বৈধ কাগজপত্র তাদের কাছে ছিল না। এরপর ঘটনাস্থলে উপজেল নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী, ওসি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ বায়েজিতসহ সরকারি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। এরপর ওই ট্রাক থেকে ৫৪৯ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। এ ব্যাপারে এসআই তপন কুমার সিংহ কালোবাজারির মাধ্যমে চাল মজুদের অভিযোগে আটক দুজনসহ অপরিচিত ব্যক্তিদের আসামি করে মণিরামপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ পরে ডিবি পুলিশ তদন্তের দায়িত্ব পায়। মামলার তদন্ত শেষে আটক আসামিদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্যে যাচাই-বাছাই করে ঘটনার সাথে জড়িত থাকায় ওই ছয়জনকে অভিযুক্ত করে এই চার্জশিট জমা দিয়েছেন কর্মকর্তা। চার্জশিটে অভিযুক্ত ভাইস চেয়ারম্যান বাচ্চুকে পলাতক দেখানো হয়েছে। আর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে চার্জশিটে।

মন্তব্য
Loading...