নানাভাবে প্রতিহিংসার শিকার অমিত

0 ১৬

প্রতীক চৌধুরী

অমিত শিকদার ওরফে বিষু। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের আওয়ামী লীগ কর্মী। তাকে চারটি মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ। ইতোমধ্যে মাদকের একটি মামলায় আদালতে প্রমাণিত হয়েছে- তাকে ফাঁসিয়েছিল পুলিশ। আদালত অভিযুক্ত সাত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেন। সেটির আপিল শুনানি চলমান আছে। অপর আরও দুটি মাদক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে যশোরে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। আর একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা (আইসিটি) আইনে অমিত শিকদারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার দাবি, চারটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর প্রকাশ্য ও নেপথ্যে রয়েছে দলীয় প্রতিপক্ষের লোকজন। তারা হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। মূলত দলীয় প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার তিনি।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুটি গ্রুপ রয়েছে। অমিত শিকদার বিষু সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তিনি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক প্রয়াত নন্দ কুমার শিকদারের ছেলে। এক প্রত্যয়নপত্রে আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেছেন, অমিত শিকদার আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। তার পরিবার আওয়ামী লীগ পরিবার। সৎ, পরিশ্রমী ও রাষ্ট্রবিরোধী কোন কার্যকলাপে জড়িত নয়।

বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যশোরে দুটি মাদক মামলা!

নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৬ জুন অমিত শিকদার বিষুকে দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক দেখিয়ে কোতয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘৬ জুন রাত ৫টা ২০ মিনিটে কোতয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর আদর্শপাড়ার আজিজুরের বাড়ির ভাড়াটিয়া অমিত শিকদার ওরফে বিষুর (৩৫) দেহ তল্লাশিকালে তাহার পরিহিত প্যান্টের ডান পকেট হইতে পলিথিনে বিশেষভাবে মোড়ানো দুই হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।’ ওই মামলার এহাজারে অমিত শিকদার বিষুকে প্যান্টের পকেট থেকে ইয়াবা উদ্ধার দেখানো হলেও তার পরনে ছিল লুঙ্গি। যা ওই দিন বিকেলে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা ছবিতে স্পষ্ট আছে।
এদিকে, দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ আটকের মামলায় কারাগারে পাঠানোর তিনদিন পর আরও একটি মাদক মামলায় অমিত শিকদার বিষুকে তিন নম্বর আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই মামলারও একই ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, ‘৬ জুন রাত ৩টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশের অভিযানের সময় অমিত শিকদার বিষু পালিয়ে যায়।’ অথ্যাৎ পুলিশের দুটি এজাহারের তথ্যমতে, পুলিশের অভিযানে পালিয়ে যাওয়া আসামি দুই ঘন্টা পর একই স্থানে আবার ফিরে আসে। পরবতীতে রাত ৫টা ২০ মিনিটে তাকে দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। যা অবিশ^াসও বলে মন্তব্য করেছেন অমিত শিকদার বিষু ও তার মা ইতি শিকদার’।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বর্তমানে শৈলকূপা থানায় কর্মরত এসআই আমিরুজ্জামান বলেন, বাড়ি থেকে তুলে আনার অভিযোগ সঠিক নয়। কোতয়ালি থানা এলাকা থেকেই তাকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়। বিষু মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। এজাহারে অসঙ্গতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওসি সাহেব কিভাবে মামলা নিয়েছেন জানি না।
বিষুর মা ইতি শিকদার বলেন, ২০১৮ সালের ৬ জুন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কোতয়ালি থানার এসআই আমিরুজ্জামানসহ একদল পুলিশ আমাদের বাড়িতে যায়। এসময় ছেলের খোঁজ করে। তখন বিষু ঘরে ঘুমিয়েছিল। আমি তাকে ডেকে দিই। লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় বিষুকে টেনেহেঁচড়ে ধরে নিয়ে গাড়িতে তোলে। আমি বাধা দিই, জানতে চাই, ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। তখন তারা জানাই যশোর কোতয়ালি থানায় নিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে কালীগঞ্জ থানার ওসিকে জানাই। এরপর বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে জানিয়ে দিই ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর। কোতয়ালি থানায় গিয়ে দেখি ছেলেকে ইয়াবা উদ্ধার মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। পুলিশ দুটি মিথ্যা মাদক মামলায় বিষুকে ফাঁসিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতির প্রতিহিংসায় পুলিশকে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে সীমাহীন হয়রানি করা হচ্ছে।

যশোরে দুই পুলিশ কর্মকর্তার নামে বিভাগীয় মামলা

ভিকটিম ও তার পরিবারের অভিযোগ, ২০১৮ সালের ৬ জুন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাড়ি থেকে অমিত শিকদার বিষুকে তুলে আনেন যশোরে কোতয়ালি থানার এসআই আমিরুজ্জামান ও তারেক মোহাম্মদ নাহিয়ান। ওইদিন যশোর সদরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ তাকে গ্রেফতার দেখান। এরপর দুটি মাদক মামলা দায়ের করা হয়। ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে দাবি করে ওই বছরের ৮ জুন তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর অভিযোগ দেন অমিত শিকদারের মা ইতি শিকদার। অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইজি মো. দিদার আহমেদ ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ দুই দফায় তদন্ত করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর সত্যতা পেয়েছে। গত ১২ অক্টোবর বর্তমান যশোর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত এসআই তারেক মোহাম্মদ নাহিয়ানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। যার নম্বর ৪২/২০২০। গত ২৫ অক্টোবর বর্তমানে ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানায় কর্মরত এসআই আমিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে যশোর জেলায় বিভাগীয় মামলা হয়েছে। যার নম্বর ৪৭/২০২০। মামলা দুটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে (অপরাধ ও প্রশাসন)। গত ১৬ নভেম্বর মামলার স্বাক্ষী হিসেবে অমিত শিকদার বিষু ও তার মা ইতি শিকদারকে ডাকা হয়। তারা হাজিরা দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে এসআই তারেক মোহাম্মদ নাহিয়ান বলেন, ফাঁসানোর অভিযোগ সঠিক নয়। ওইদিন আমার নাইট ডিউটি ছিল। অন্য একটি পার্টি তাকে (অমিত শিকদার) ধরেছিল। জিডিতে (সাধারণ ডায়েরি) টাইম এলোমেলো হয়েছে। এজন্য বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, এসআই নাহিয়ান ও আমিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে। নির্দোষ হলে মওকুফ হবে।

ঝিনাইদহে ৭ পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন

২০১৬ সালের ১০ মার্চ রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুলে নিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেন কালীগঞ্জ এসআই লিটন কুমার, এসআই বিশ্বজিত পাল, এএসআই গাফফারসহ পুলিশ সদস্যরা। এএসআই গফফার ও ২ জন কনস্টেবল অমিত শিকদারকে মাদকসহ গ্রেফতার দেখান। ১১ মার্চ থানায় কর্মরত এসআই লিটন কুমার বিশ্বাস মিথ্যা জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে ইয়াবা দিয়ে অমিত শিকদারকে আদালতে সোপর্দ করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বিশ্বজিত পাল সাক্ষীদের ১৬১ ধারায় অসত্য জবানবন্দি রেকর্ড করে ও অসত্য পুলিশ প্রতবেদন আদালতে দাখিল করে। ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মামলাটির বিচার হয়। মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অমিত শিকদার ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় হয়রানির প্রতিকার চেয়ে চিফ জুডিয়িাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিস মামলা করেন। পরবর্তীতে আদালত মিস মামলাটির তদন্ত করতে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে (সদর সার্কেল) দায়িত্ব দেন। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন তিনি। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এক আদেশে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপারকে ওই ৫ জন পুলিশ সদস্য, সেই সময়ে অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন ও ডিউটি অফিসার ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল ঝিনাইদহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন ইমরান হোসেন। মামলাটি ওই আদালতে চলমান রয়েছে।

হত্যাচেষ্টা ও আইসিটি আইনে মা-ছেলের নামে মামলা

২০১৯ সালের ৭ জুন ঝিনাদহের কালীগঞ্জ থানায় আইসিটি আইনের মামলায় আসামি করা হয় অমিত শিকদার ও তার মা ইতি শিকদারকে। মামলার বাদী একই উপজেলার ফয়লা গ্রামের আফসার লস্করের ছেলে গোলাম রসুল। তিনি এজারের উল্লেখ করেন, আসামি অমিত শিকার নিজের ফেসবুক থেকে বাদীকে র‌্যাবের দালাল ও ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্যকে জড়িয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও অশ্লীল বক্তব্য প্রদান করেছে। ওই মামলায় অমিত শিকদারের নামে চার্জশিট হয়েছে। তবে তার মায়ের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ২৯ মে নিশ্চিন্তপুর মহাশ্মশানে অমিত শিকদারকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ওই বছরের ২ জুন কালীগঞ্জ থানায় মামলা পাঁচজনের নামে মামলা হয়। অমিত শিকদারের দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেনÑ কালীগঞ্জের আড়পাড়া গ্রামের মোমিন মৌলভীর ছেলে মাসুদুর রহমান, শিবলী নোমানী, মধুগঞ্জ কাঁঠালবাগান এলাকার আকবর আলীর ছেলে আশরাফুল আলম আশরাফ, নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মিজানুর (সিআই) ছেলে সোহাগ ও মধুগঞ্জ কাঁঠালতলা এলাকার মিজানুর ইসলামের ছেলে ইমন।
অমিত শিকদার ও তার মা ইতি শিকদার বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন পুলিশকে ব্যবহার করে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়নি। হত্যার চেষ্টা করছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আমরা এদেশে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।

মন্তব্য
Loading...