ঝুঁকিমুক্ত সিজারের বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনে সফল নিকুঞ্জ বিহারী

0 ১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

কমপ্লিট (সেন্ট্রাল) প্লাসেন্টা প্রিভিয়া মানেই ১৫ থেকে ২০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। থাকে মৃত্যুঝুঁকি। আর বেঁচে যাওয়া রোগীদের প্র¯্রাবের থলি ছিদ্র হয়ে সারা জীবন প্র¯্রাব ঝরার যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু বিকল্প পদ্ধতিতে রক্তপাত ছাড়াই সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া অস্ত্রোপচার করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড গড়েছেন বলে দাবি করেছেন যশোরের বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। তিনি ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেসরকারি একটি হাসপাতালে নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়ার টনি মাহমুদের স্ত্রী সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া মনিরা খাতুনের (২৬) তিনি বিকল্প পদ্ধতিতে প্রথম সিজার করেন। আর সর্বশেষ গত ১৬ নভেম্বর তিনি সিজার করেন ঝিনাইদহের শৈলকূপার চর ধলহরাচন্দ্র গ্রামের তরিকুল ইসলামের স্ত্রী লিজা আক্তারের।
অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার বলেন, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হলো একটি মারাত্মক জটিল অবস্থা। এর নাম শুনলেই আঁতকে ওঠেন গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরা। সাধারণত গর্ভবতী নারীদের জরায়ুর ওপরে গর্ভফুল থাকে। আর প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হলে, ফুল একদম নিচের দিকে চলে এসে গর্ভফুলটি জরায়ুর মুখে লেগে থাকে। রোগীর জন্য অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে ওঠে এটি। তিনি বলেন, এমন অবস্থায় অস্ত্রোপচার করাও অধিক ঝুঁকিসম্পন্ন। সন্তান প্রসবের সময় মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। কারণ যখন সার্ভিক্স খোলে তখন এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেননা প্লাসেন্টা খুব শিগগিরই জরায়ু থেকে আলাদা হয়ে যায়। ফলে রোগীর মারাত্মক রক্তপাত ঘটে, যা শিশুকেও প্রভাবিত করে। তখন প্রসূতির জন্য প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ২০ ব্যাগ রক্ত। থাকে মৃত্যুঝুঁকি। বেঁচে যাওয়া রোগীদের প্র¯্রাবের থলি ছিদ্র হয়ে সারা জীবন প্র¯্রাব ঝরার যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু বিকল্প পদ্ধতিতে রক্তপাত ছাড়াই সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া অস্ত্রোপচার করে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তিনিই প্রথম এ চিকিৎসা শুরু করেছেন বলেন চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার।
জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেসরকারি কিংস হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নীলগঞ্জ তাঁতীপাড়ার টনি মাহমুদের স্ত্রী মনিরা খাতুনকে (২৬)। গর্ভবতী অবস্থায় তার প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হয়েছিল। ভর্তির পরদিন রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন গাইনি অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। রোগী সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত চরম হতাশার মধ্যে দিন কেটেছে রোগীর স্বজনদের। এখন মা ও সন্তান ভালো আছে। রোগীর স্বামী টনি মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, আমার স্ত্রী (মনিরা) গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে একাধিক গাইনী সার্জনের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়েছে। সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হওয়ার পর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারে কেউ ঝুঁকি নিতে চাননি। সর্বশেষ ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের কাছে আনা হয়। তার অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসাসেবায় আমার স্ত্রী ও সন্তান সুস্থ। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই ১৮ ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে রেখেছিলাম। কিন্তু ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার রোগীর রক্তপাতবিহীন অস্ত্রোপচারে সকলকে অবাক করে দিয়েছেন।
এদিকে, ঝিনাইদহের শৈলকূপার চর ধলহরাচন্দ্র গ্রামের তরিকুল ইসলামের স্ত্রী লিজা আক্তারের প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হয়। প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো লিজার অপারেশন হয় ১৬ নভেম্বর। অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার তাকে বিকল্প পদ্ধতিতে অপারেশন করেছেন। লিজা ও তার সন্তান ভাল আছেন।
লিজার স্বামী তরিকুল ইসলাম বলেন, আল্ট্রাসনোয় রোগ ধরা পড়ার পর চিন্তায় চিন্তায় সময় কেটেছে। এখন চিন্তামুক্ত। স্ত্রী ও সন্তান ভালো আছে। দুই একদিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হবে।
ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার বলেন, এই রোগীর অস্ত্রোপচারে নিজস্ব চিন্তা-চেতনা থেকে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। পদ্ধতি প্রয়োগে রক্তপাতবিহীন রোগীর অস্ত্রোপচারে সফলতা এসেছে। তবে এক্ষেত্রে দুইবার রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রথম অস্ত্রোপচারে জরায়ু ও গর্ভফুল ভিতরে রেখে শুধু সন্তান বের করে আনা হয়। এরপর চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। ৪৮ ঘণ্টা পর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভবতী ফুল বেরসহ বাকি কাজটুকু করা হয়েছে। এ অপারেশনের সময় রোগীকে অচেতন করেন অ্যানেসথেটিস্ট (চিকিৎসক) আফজাল হোসেন। তিনি বিকল্প পদ্ধতিতে অপারেশন করায় ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারকে প্রশাংসা করে অপারেশন পরবর্তী মন্তব্য খাতায় লিখেছেন, সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়ায় ডা. নিকুঞ্জ বিহারী ‘সুপার স্পেশালিস্ট’।

মন্তব্য
Loading...