আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার পেলেন নড়াইলের কিশোর সাদাত

0 ১৩

নড়াইল প্রতিনিধি

আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার লাভ করলেন বাংলাদেশের নড়াইলের কিশোর সাদাত রহমান। সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে তিনি শিশুদের নোবেল খ্যাত আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।
গত শুক্রবার নেদারল্যান্ডসে চূড়ান্ত পর্বে সাদাতের নাম ঘোষণা করেন কর্তৃপক্ষ। এরপর নোবেলজয়ী পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই বিজয়ী সাদাত রহমানের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
সাদাতের সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া অন্য দুজন প্রতিযোগী ছিলেন মেক্সিকোর ইভান্না ওরতেজা সেরেট ও আয়ারল্যান্ডের সিয়েনা ক্যাস্টেলন। ৪২টি দেশের ১৪২ জন শিশুর মনোনয়নের মধ্য দিয়ে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।
আড়ম্বরপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত এক বা একাধিক শিশুর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
২০০৫ সালে রোমে অনুষ্ঠিত নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের এক শীর্ষ সম্মেলন থেকে এই পুরস্কার চালু করে ‘কিডস-রাইটস’ নামের একটি সংগঠন। শিশুদের অধিকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় অসাধারণ অবদানের জন্য প্রতিবছর আর্ন্তজাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা ওই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। গত বছর সুইডেনের শিশু পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ ও ক্যামেরুনের ডিভিনা মালম যৌথভাবে মর্যাদাপূর্ণ ওই পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে এই পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই পরের বছর জয় করেছিলেন নোবেল।
নড়াইল আবদুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ১৭ বছর বয়সী সাদাত রহমান। সাদাত ও তার দল সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষায় নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সাদাত সম্পর্কে কিডস রাইটসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সাদাত একজন ‘তরুণ চেঞ্জমেকার’ ও সমাজসংস্কারক। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে এক কিশোরীর (১৫) আত্মহত্যার পর কাজে নামে সাদাত। সে তার বন্ধুদের সহায়তায় ‘নড়াইল ভলেন্টিয়ারস’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সংগঠনটি বেসরকারি সংস্থা একশনএইডের ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ– ২০১৯-এ বিজয়ী হয়ে তহবিল পায়।
এই তহবিলের মাধ্যমে তারা ‘সাইবার টিনস’ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা জানতে পারে কীভাবে ইন্টারনেট দুনিয়ায় সুরক্ষিত থাকতে পারে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিশোর-কিশোরী এই অ্যাপ ব্যবহার করছে। এই অ্যাপের মাধ্যেম ৬০টির বেশি অভিযোগের মীমাংসা হয়েছে এবং ৮ জন সাইবার অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে সাদাত সেফ ইন্টারনেট, সেফ টিনএজার নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তিনি এবং তার বন্ধুরা ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্কুলে স্কুলে সেমিনার, কর্মশালা করছে। প্রতিটি স্কুলে ‘ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ক্লাব’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন।
সাদাত রহমান জানান, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে পিরোজপুরের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা তাকে নাড়া দেয়। দেশে এ ধরনের আরও ঘটনা ঘটছে। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৯শতাংশ কিশোর-কিশোরী এ রকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। কিন্তু নিজেদের সমস্যা কাউকে বলতে পারে না তারা। পুলিশ তো দূরের কথা, অনেকেই নিজের মা-বাবাকেও এ ব্যাপারে কিছু জানায় না। শেষ পর্যন্ত অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
সাদাত আরো বলেন, এ ধরনের উপলব্ধি থেকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিশু-কিশোরদের সাহায্য করতে অনলাইন প্লাটফর্ম সাইবার টিনসের যাত্রা শুরু করা হয় গত বছর অক্টোবর মাসে। এই অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগী কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগাযোগ সৃষ্টি করা হয়। প্রথমত, ভুক্তভোগীকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া হয়। অভিযুক্তকেও নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে বিষয়টি অপরাধ পর্যায়ে পৌঁছালে পুলিশ বিভাগকে জানানো হয়। নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন (পিপিএম বার) এর সহযোগিতায় এই কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।
এদিকে আর্ন্তজাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার লাভ করায় নড়াইলসহ দেশব্যাপী আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছে।
বীরমুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও শিক্ষক নেতা আশিকুর রহমান বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন পিস অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী নড়াইলের সূর্যসন্তান সাদাত রহমানকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। দুর্বার মেধা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বিশ্বঅঙ্গনে নড়াইলের নামকে আরো একবার সম্মানিত করায় তাকে জানাই মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, নড়াইলের পক্ষ থেকে এবং নড়াইল সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন খান নিলু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন পিস অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী সাদাত রহমানকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। দুর্বার মেধা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বিশ্বঅঙ্গনে নড়াইলের নামকে আরো একবার সম্মানিত করায় তাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

মন্তব্য
Loading...