পেঁয়াজ সংরক্ষণ : প্রকল্প তৈরি করতেই বছর পার

0 ১৯

এইচ আর তুহিন

এখনও দেশে কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া তেমন লাগেনি। বিশেষ করে পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারিভাবে আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। মজুতদার ও অল্প কিছু কৃষক সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ বাছাই ও গ্রেডিংয়ের পর বাঁশের মাচা, ঘরের সিলিং, প্লাস্টিক বা বাঁশের র‌্যাক অথবা ঘরের পাকা মেঝেতে শুষ্ক ও বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করেন। আর সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে পেঁয়াজ ওঠার সময় বড় অংশ পচে যায়। পাশাপাশি এসময় কৃষক দামও পান না। এ সমস্যা সংকটে গত বছর সরকার দেশের কয়েকটি স্থানে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) পেঁয়াজ গুদাম নির্মাণ করার চিন্তাভাবনা করে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এজন্য প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু করে। তারা ২০১৯ সালে প্রাথমিকভাবে প্রকল্প তৈরি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরমধ্যে এক বছর পার হলেও প্রকল্প চূড়ান্ত হয়নি।
দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি থাকে বলে আমদানির মাধ্যমে তা পূরণ করা হয়। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে দেশে পেঁয়াজের সংকট দেখা দেয়। পরপর দুবছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে আপদকালীনে পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার। আমদানির উপর নির্ভরশীল হতে হয় সরকারকে।
তবে এ বিষয়ে গত বছর প্রতিদিনের কথাকে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সচিব এনামুল হক। তিনি জানিয়েছিলেন, বছরে একই সময়ে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে না থাকায়, আমরা শিক্ষা নিয়ে দেশের কয়েকটি স্থানে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) পেঁয়াজ গুদাম নির্মাণ করতে প্রকল্প তৈরি করেছি। যদি কোনো কারণে দাম বেড়ে যায়, তাহলে এসব গুদাম থেকে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করবে টিসিবি।
এ বছর তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ চলছে। শিগগির প্রকল্প চূড়ান্ত হবে।
টিসিবি ও কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে আলু, ডাল, চাল ও গমের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পেঁয়াজ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। দেশে পেঁয়াজের বাৎসরিক গড় চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। দেশে উৎপাদন হয় প্রায় ২০ লাখ টন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে তোলার পরপর অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টন ঘাটতি দেখা দেয়। সাধারণত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে এ ঘাটতি পূরণ করা হয়।
টিসিবি সূত্র জানায়, দেশে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম নির্মিত হবে। বেনাপোল স্থলবন্দর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুর ও রংপুরে অধিক পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এর পাইকারি বড় মোকাম বসে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, দিনাজপুর ও পাবনায়। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব স্থানে পেঁয়াজ গুদাম নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রধান রুট সাতক্ষীরার ভোমরা ও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরেও আধুনিক গুদাম নির্মিত হবে।
সূত্র জানায়, সারা দেশে কয়েকটি আধুনিক গুদাম নির্মাণের ফলে স্থানীয়ভাবে আর পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে হবে না। এসব গুদামে তাপমাত্রা হবে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস। পেঁয়াজ গুদাম নির্মাণে আলাদা প্রকল্প তৈরি শুরু করেছে টিসিবি। এ ধরনের প্রকল্প বাংলাদেশে প্রথম। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে ধারণা নেয়া হচ্ছে। তবে এখনো গুদামের সংখ্যা, নির্মাণের স্থান ও প্রকল্প ব্যয় চূড়ান্ত হয়নি। আর এ কাজ শুরু হয়েছে মূলত পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে। এসি গুদাম নির্মিত হলে পেঁয়াজ নিয়ে আর বিপাকে পড়বে না সরকার।
এ প্রসঙ্গে টিসিবি সচিব এনামুল হক বলেন, সারা দেশে আলু সংরক্ষণে গুদাম রয়েছে, অথচ পেঁয়াজের জন্য নেই। গত দুই বছরে পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশে প্রথমবারের মতো এসি পেঁয়াজ গুদাম নির্মাণ করা হবে। গুদাম কোথায় কোথায় নির্মাণ করা যায় সে বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ চলছে।
প্রসঙ্গত, নানা বাহানা, বিভিন্ন উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজের দাম প্রতিদিন বাড়িয়ে চলেছেন মজুতদাররা। ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী চার মাসে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে মোট ২৫ বার। ৩০ টাকা থেকে শুরু করে কখনো ৫০, ৯০, ১২০, ১৫০, ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। এক পর্যায়ে তা ডাবল সেঞ্চুরির পরও থামেনি। সর্বশেষ ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
এ বছরও সেপ্টেম্বর মাসে ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে রাতারাতি ৩৫ টাকার পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১০০ টাকার উপরে বিক্রি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আড়তদার বলেন, পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে মজুতদারদের কারসাজি রয়েছে। তারা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে আমাদের চাহিদা মোতাবেক পেঁয়াজ দিচ্ছে না। সরকার তদারকি ও পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না নেয়ায় এ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।

মন্তব্য
Loading...