হকার মিরাজুলের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে

0 ৪৬

দেশে গ্রন্থাগার ও ডাকঘরের অবস্থা একই রকম হয়েছে। আগেকার দিনে ডাকঘর যে কত জরুরি ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু এখন সেই ডাকঘর যেন অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখন আর কেউ চিঠি লেখে না। এই চিঠির প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে মিটাচ্ছে মোবাইল ও ইন্টারনেট। ডাক পিওন আগে যে ভাবে গ্রামে ও শহরে চিঠির ব্যাগ ঘাড়ে করে ঘুরে বেড়াতো এখন ওই পিওনকে বছরে একবারও দেখা যায় না। কেউ ডাক টিকিট কিনতে বা লেখা চিঠিটা ডাকবাকসে ফেলতে কালে-ভদ্রেও মাড়ায় না ডাকঘরের পথ। গ্রন্থাগারের অবস্থাও একই। এখন কেউ আর বই পড়ে না। যশোর সরকারি গণগ্রন্থগারের গ্রন্থাগারিক বলেছেন, এখন বই পড়ার ধরন পাল্টেছে। আগে পাঠকরা যে সব বই লাইব্রেরিতে পড়তো এখন পড়ে ই-বুকে। এখন ফেসবুক নিয়ে মানুষ ব্যস্ত থাকে। এ কারণে লাইব্রেরিতে আসার সুযোগ কমে গেছে।
আসলে দিন বদলের হাওয়ায় অনেক কিছু ভেসে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির বিপক্ষে আমরা নই। কিন্তু প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ সমর্থনযোগ্য নয়। ই-বুকে পাঠক বই পড়ছে কিনা জানিনে। তবে তার জীবনের মূল্যবান সময় যে ফেসবুকের পেছনে কেটে যাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞান বিকাশের অন্তরায় নয়। কিন্তু তা বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। জ্ঞান অর্জনের প্রতি মনীষীরা গুরুত্বারোপ করেছেন। সক্রেটিসের মতে শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যেও আবিষ্কার। প্লোটো বলেছেন, শরীর ও আত্মার পূর্ণতার জন্য যা প্রয়োজন তার সবই হলো শিক্ষা। অতীতকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যতের জন্য সুন্দর সমৃদ্ধ সোপান রচনা করে মানুষ। তাই অতীতকে জানা প্রতিটি সচেতন মানুষের একান্ত দরকার। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। যার মাধ্যম হলো বই। এই বইয়ের সংরক্ষণাগার হলো গ্রন্থাগার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, গ্রন্থাগার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধন স্বরূপ। ফরাসি লেখক আন্দ্রেঁজিদ বলেছেন, আমাদের বিচার বুদ্ধি গড়ে ওঠে পেরিয়ে আসা সময়ের মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। সেই মূল্যবোধ সৃষ্টিতে দরকার বই। গ্রন্থাগার সেই বইয়ের যোগান দেয়। প্রমথ চৌধুূরী বলেছেন, লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চেয়ে কিছু কম নয় এবং স্কুল কলেজের চাইতে বেশি। এখানে মানুষ স্বেচ্ছায় স্বাচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়। প্রতিটি মানুষ তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এ জন্য গ্রন্থগারকে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়।
মনীষীদের এ মূল্যবান কথা আমরা শিক্ষিত বলে দাবিদাররা বুঝতে না পারলেও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের হকার মিরাজুল হক বুঝেছেন। তিনি হকারি করে যে পয়সা আয় করেন তা দিয়ে বই কেনেন। তিনি ইতোমধ্যে আড়াই লাখ টাকার চার শতাধিক বই কিনেছেন। তিনি মনে করেন পাঠাগার থাকলে এলাকার গৌরব বাড়ে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে জাততে ও জানাতে ভূমিকা পালন করে পাঠাগার। তিনি তার এলাকায় বঙ্গবন্ধু পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজ অর্থায়নে সেটি পরিচালনা করতেন। কিন্তু অর্থ ও নিজস্ব জায়গার অভাবে সেটি সুষ্ঠুভাবে চালাতে পারছেন না। কালীগঞ্জ শহরে যে খাস জমি আছে তা থেকে তিনি পাঠাগরের জন্য কিছুটা জমি বরাদ্দ পেলে পাঠাগার চালানো তার জন্য সহজ হতো। হকার মিরাজুলের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।
মনীষীদের মূল্যবান উক্তি থেকে সহজেই অনুমান করা যায় মানুষের জীবনে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কতখানি। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কল্যাণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন জ্ঞান। বই পড়ার মাধ্যমে এই জ্ঞানের পূর্ণতা আসে। সচেতনতা সৃষ্টি হয়। একটি জাতি ওই সময় সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়, যখন তার প্রতিটি মানুষ জ্ঞানী ও সচেতন হয়ে গড়ে ওঠে। আর এ জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। তাই শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জে পাঠক নির্ভর পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে।

মন্তব্য
Loading...