কর্মকর্তাদের নির্দেশেই বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালায় একদল কিশোর

৬৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন বন্দি নিহত ও ১৫ জন জখমের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে নৃশংস নির্যাতনে অংশ নেয় তাদেরই আশীর্বাদপুষ্ট অন্তত সাতজন কিশোর অপরাধী। তারা দীর্ঘদিন ধরে এই কেন্দ্রে থাকায় কর্মকর্তাদের ফরমায়েশ খাটতো।
শনিবার দুপুরে নিজ দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে এমন তথ্য জানিয়েছেন যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন।
তিনি বলেন, ১৮ জন কিশোর নির্যাতনে জ্ঞান হারালেও টানা ছয় ঘন্টা কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়। এতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয়, পুলিশ হেফাজতে কেন্দ্রের তত্ত্ববধায়ক (সহকারী পরিচালক), সহকারী তত্ত্বাবধায়কসহ ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তদন্তে নৃশংস হত্যাকা-ের কারণ ও ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়ায় কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন বলেন, গত ৩ আগস্ট কিশোর হৃদয়কে (যে চুল কাটায় পারদর্শী) চুল কেটে দিতে বলেন কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রধান (হেড গার্ড) নূর ইসলাম। ঈদের আগে হৃদয় প্রায় দুশ’ বন্দির চুল কাটায় তার হাত ব্যথা উল্লেখ করে চুল কাটতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নূর ইসলাম কেন্দ্রে’র তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ’র কাছে অভিযোগ করেন, ‘ওরা ট্যাবলেট খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে রয়েছে।’ এছাড়াও তিনি হৃদয় ও তার বন্ধু পাভেলের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত করেন। সেখানে উপস্থিত কিশোর নাঈম অভিযোগ শুনে বিষয়টি পাভেলকে জানিয়ে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাভেল তার কিছু অনুসারী কিশোরকে নিয়ে নূর ইসলামকে মারপিট করে। এতে তার হাত ভেঙে যায়। কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হেডগার্ডকে মারপিটের ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষ। এরপর গত ১৩ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতিসভা ডাকা হয়। ওই সভায় ১৯ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে অভিযুক্তদের শাস্তির নির্দেশ দেয়া হয়। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী তত্ত্বাবধায়ক অভিযুক্ত বন্দিদের চড়থাপ্পড় মারেন। এরপর কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ৭-৮ জন কিশোরের নেতৃত্বে বন্দিদের মুখে গামছা ঢুকিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাইরে বের করে টেনে ধরে পেছনে বেধড়ক মারপিট করা হয়। লোহার রড, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ইত্যাদি দিয়ে বেপরোয়া মারপিট করা হয়। অচেতন হয়ে গেলে মার বন্ধ করে ফের জ্ঞান ফিরলে মারপিট করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারপিটের পর গুরুতর জখম অবস্থায় এদের একটি ঘরে ফেলে রাখা হয়। একজন ‘কম্পাউন্ডার’ দিয়ে সামান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও এদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়। পুলিশ, জেলা প্রশাসন কিংবা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাউকে বিষয়টি জানাননি কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টার দিকে একজন বন্দি মৃত্যুর পথযাত্রী হওয়ায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, এরপর আমরা খবর পেয়ে কেন্দ্রে যাই। সেখানে ঢুকে ডরমেটরিতে দেখি আহত বন্দিরা যন্ত্রণায় কাতর। পুলিশের পিকআপ ও সির্ভিল সার্জনের দেয়া অ্যাম্বুলেন্সে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় শুক্রবার ভোরে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়কসহ ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়া গেছে। সেই পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন আরও বলেন, নির্যাতনে অংশ নেওয়া ৭-৮ জন কিশোরের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। তারা দীর্ঘদিন ওই কেন্দ্রে থাকায় কর্মকর্তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। সার্বিক বিষয়ে তদন্ত হবে। যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। যাতে কেউ অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়, সেই বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি তদন্ত কমিটির পাশাপাশি পুলিশও মামলার তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রাব্বানী, যশোর কোতয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান প্রমুখ।

মন্তব্য
Loading...