দুর্বল ব্যবস্থাপনায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র মরণফাঁদ!

৬৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে গত ১০ বছরে অন্তত চার দফা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। যাতে মারা গেছে পাঁচ কিশোর। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার খুন হয় তিনজন। কিন্তু কেন এমন ঘটনা বারবার ঘটছে? এমন প্রশ্ন ঘুরে ফিরেই আসছে।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের গাফিলতির পাশাপাশি অব্যবস্থাপনার কারণে ‘কিশোর সংশোধন’ কেন্দ্র মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে বলে জানাচ্ছে অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র। এর আগে এখানে খুনের ঘটনা ঘটলে গঠিত তদন্ত কমিটি ‘অনিয়ম’ বন্ধসহ কেন্দ্র পরিচালনায় একগুচ্ছ সুপারিশ করে। কিন্তু সেই সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জানা যায়, ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট আকাশ (১২) নামে এক শিশুকে প্রথমে শ্বাসরোধ ও পরে টিনের টুকরো দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহত আকাশকে ২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গা থেকে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুন কেন্দ্রে বন্দি থাকা নূর ইসলাম (১৫) নামে এক শিশু আত্মহত্যা করে। নূর ইসলামকে চুরির মামলায় ওই বছরের ২২ মে গাইবান্ধা থেকে যশোর পাঠানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৪ সালে ৫ মে কেন্দ্রে বন্দিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় কয়েক কিশোর ভাঙা কাঁচ দিয়ে শরীর কেটে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানায়। দর্শনার্থী একজন অভিভাবককে মারধরের অভিযোগের জের ধরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই সময় বন্দি কিশোররা কেন্দ্রে ভাঙচুর ও পুলিশের ব্যারাকে হামলা চালায়। আর সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রের মধ্যে পিটিয়ে তিন কিশোরকে হত্যা করেছে কর্তৃপক্ষ। এসময় আহত হয়েছে আরো ১৫ কিশোর।
যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সাবেক সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আসা কিশোরদের একটা বড় অংশ অল্প বয়সে ভয়ঙ্কর অপরাধের সাথে যুক্ত। তাদের সংশোধনের জন্য এই কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যরাও অদক্ষ। এছাড়া কেন্দ্রটিতে সব সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বন্দি থাকে। তাই সামর্থ্যরে অভাবের কারণে অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের অধিকাংশের শারীরিক ফিটনেস নেই। কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে তারা প্রশিক্ষিতও না। সঙ্গতকারণে তারা ‘গায়ের জোরে’ বন্দিদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ফলে সব সময় গার্ড আর বন্দিদের মধ্যে একটা বিরোধ বেঁধেই থাকে। এজন্য মাঝে মধ্যেই হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকার কিশোর অপরাধীরা আদালতের মাধ্যমে এই কেন্দ্রে আসে। যারা অনেকে হত্যা, বোমাবাজি, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের সাথে যুক্ত। কিন্তু কেন্দ্রের মধ্যে তাদের মানসিক চিকিৎসার ‘কার্যকরী ব্যবস্থা’ না থাকায় বন্দি অবস্থায় তারা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এনিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মাঝে মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটে। তাদের কাছে কর্মকর্তারাও মাঝে মধ্যে লাঞ্ছিত হন। তাই কর্মকর্তারা নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক সময় কিশোর গ্রুপের কোনো একটিকে নিজের ছত্রছায়ায় রাখেন। যারা আবার ক্ষমতার প্রভাবে অন্য কিশোরদের উপর নিয়মিত নির্যাতন চালায়। মূলত কর্মকর্তাদের মদদে তারা কেন্দ্রের মধ্যে আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
আরেকটি কারণ হিসেবে কেন্দ্রের সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন, কেন্দ্রে ১৮ বছরের কম বয়সীদের রাখার নিয়ম। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হয় না। আদালতে বয়সের প্রমাণপত্র দেখিয়ে তারা এই কেন্দ্রে আসলেও প্রকৃত বয়স অনেকের ১৮ বছরের বেশি। এছাড়া এখানে দীর্ঘদিন থাকার পর বয়স ১৮ বছরের বেশি হলে জেলখানায় পাঠানোর নিয়ম। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতায় বছরের পর বছর যুবকরা এখানে থেকে যায়। তারাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এছাড়াও খাবার সরবরাহে অনিয়ম, দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হলেও ঠিকমত মনিটরিং হয় না। যদিও এর আগে গঠিত একটি কমিটি এসব অনিয়ম বন্ধে এক গুচ্ছ সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই বদলায়নি। আর এইসব কারণে বারবার ঘটছে এইসব ঘটনা।

মন্তব্য
Loading...