স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত কেশবপুর

১৩০

এইচ আর তুহিন ও উৎপল দে

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের উপনির্বাচন আজ ১৪ জুলাই মঙ্গলবার। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও নির্বাচন কমিশনকে এ আসনে উপনির্বাচন করতে হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে কমিশনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যালটের মাধ্যমে এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সকাল ৯টা থেকে একটানা বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে নির্বাচনী এলাকায় ইতোমধ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে কমিশনের যুগ্মসচিব (জনসংযোগ) এসএম আশাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে এবং আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটপ্রদান করতে পারেন, সেজন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনী স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোটারদেরকে ভোট প্রদান এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের জন্য নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি করোনা পরিস্থিতির কারণে এই উপনির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ভোট না পেছালে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণাও আসে এ দলটির পক্ষ থেকে। অপরদিকে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ১৪ জুলাই হাওয়ায় এদিনটির পরিবর্তে যেকোনও দিন ভোটগ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, নির্বাচন পেছানোর কোনও সুযোগ তাদের নেই।
নির্বাচন উপলক্ষে সোমবার মধ্যরাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় বেবিট্যাক্সি/অটোরিকশা, ইজিবাইক ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, কার, বাস-ট্রাক ও টেম্পো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া ১২ জুলাই মধ্যরাত ১২টা থেকে ১৫ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত সব ধরনের মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এ আসনে গত ২৯ মার্চ উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে শেষ সময় তা স্থগিত করা হয়। এখন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকে এ নির্বাচন করছে ইসি। ১৮ জুলাই যশোর-৬ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান নির্ধারিত ১৮০ দিন শেষ হতে যাচ্ছে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৪ দফায় বলা হয়েছে- ‘সংসদ ভেঙে যাওয়া ব্যতীত অন্য কোনও কারণে সংসদের কোনও সদস্যপদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করর জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে শর্ত থাকে যে, যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোনও দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তা হলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্থানীয় নির্বাচন অফিস। কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। বিএনপি এই উপনির্বাচনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক অংশ নিচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যাবে না এ উসিলায়। যার কারণে এ আসনটিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শাহীন চাকলাদারের বিজয় সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ৪ জুুলাই নির্বাচন কমিশনার ১৪ জুলাই যশোর ৬ কেশবপুর সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা ১১ জুলাই কেশবপুর আবু সারাফ সাদেক অডিটোরিয়ামে কেশবপুর আসনের উপনির্বাচন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি নির্বাচনের সাথে জড়িতদের নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে যশোর-৬ আসন গঠিত। গত দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পাঁচবার, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী একবার, জামায়াত দুইবার, বিএনপি একবার ও জাতীয় পার্টি একবার বিজয়ী হয়েছে। সর্বশেষ টানা চারবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশ স্বাধীনের পর এ আসনে সর্বপ্রথম এমএলএ নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত সুবোধ কুমার মিত্র, ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের পিযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, ১৯৭৯ সালে বিএনপির গাজী এরশাদ আলী, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) আবদুল হালিম, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আবদুল কাদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জামায়াতের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের এএসএইচকে সাদেক নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের শেখ আবদুল ওহাব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাকে পরে জাতীয় সংসদের হুইপ করা হয়। ২০১৪ সালে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের সহধর্মিণী আওয়ামী লীগের ইসমাত আরা সাদেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ইসমাত আরা সাদেক আওয়ামী লীগ থেকে আবারো এমপি নির্বাচিত হন। যশোর-৬ কেশবপুর সংসদীয় আসনের এমপি ইসমাত আরা সাদেক চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। ২৯ মার্চ এ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
করোনাভাইরাসের কারণে এ আসনে উপনির্বাচন গত ২১ মার্চ উপনির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার।
কেশবপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. বজলুর রশীদ বলেন, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ১১৮। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২ হাজার ১২২ জন ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৯৬ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ৭৯টি। ৩৭৪টি বুথে দায়িত্ব পালন করবেন ৭৯ জন প্রিজাইটিং অফিসার, ৩৭৪ জন সহকারী প্রিজাইটিং অফিসার ও ৭৪৮ জন পোলিং অফিসার। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ভোটাররা ভোট প্রদান করবেন।
কেশবপুর আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার (নৌকা), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হোসেন আজাদ (ধানের শীষ), জাতীয় পাটির মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা সাংবাদিক হাবিবুর রহমান হাবিব (লাঙল) প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে মাঠে নামেন ।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার বলেন, কেশবপুর আসনটি হলো আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এলাকার জনগণ নৌকা প্রতীকে ভোট দেবে।
অপর জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাবিবুর রহমান অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। সব মিলিয়ে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, ভোট কেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিও আনসার ব্যাটালিয়ন দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

মন্তব্য
Loading...