করোনাকালে গভীর সংকটে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা

১৩৬

নূর ইসলাম

বৈশ্বিক করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে গত ২৩ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সারাদেশের অন্যান্য ব্যবসার মতই বন্ধ হয়ে যায় হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো। গত ৩০ মে সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে স্বল্পপরিসরে দোকানপাট খোলার অনুমতি দেয়া হয়। এমনিতেই করোনা আতঙ্কে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। তার ওপরে এতদিন বিকাল ৪টা, ১লা জুলাই থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ঘোষণায় মারাত্মক বিপাকে পড়েছে হোটেল রেস্তোরাঁগুলো।
কোনো কোনো এলাকায় ‘টেক ওয়ে’ সিস্টেমে রেস্তোরাঁ খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বিক্রি নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে। অথচ মোটা অংকের ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ একই রয়েছে। বিক্রি কম হওয়ায় তিন ভাগের এক ভাগ স্টাফকে তিন ভাগের দুই ভাগ মজুরি দিয়ে রেস্টুরেন্টগুলো চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও দিন শেষে স্টাফের বেতন, কাঁচামালের খরচ উঠানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই মোটা অংকের লোকসানের কবলে পড়তে হচ্ছে দেশের বেশির ভাগ রেস্টুরেন্টগুলোকে।
গত কয়েক বছরে সারাদেশে হোটেল রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। যোগ হয়েছে নানা বৈচিত্র্য। হাজার হাজার কোটি টাকা পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে এই সেক্টরে। যে সমস্ত রেস্তোরাঁয় কয়দিন আগেও কর্ম ব্যস্ত ও সৌখিন ভোজনরসিক মানুষের ঢল লেগে থাকতো। করোনার থাবায় এখন শ্মশানের নীরবতা সেখানে। দেশের প্রায় ৫০ লাখ হোটেল শ্রমিকের মধ্যে ৩০-৩৫ লাখ বেকার হয়ে পড়েছে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাথে সাথে এই সেক্টরের সাথে সম্পৃক্ত শ্রমিকদের জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো থেকে প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে সরকারের। অথচ করোনাকালের এই দুর্দিনে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানগুলোকে বাঁচাতে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন জেলা শহর থেকে রেস্তোরাঁ মালিকরা প্রণোদনা চেয়ে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। এখনো কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি তার। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটিও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা নিজেরা যেমন রেস্তোরাঁগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারছে না, তেমনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থাও করতে পারছে না। বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশন ও মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে রেস্তোরাঁ ব্যবসা সচল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে কয়েক দফা স্মারকলিপি দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
এভাবে অভিভাবকহীন অবস্থায় চলতে থাকলে অচিরেই দেশের অধিকাংশ হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের হোটেল রেস্তোরাঁ সেক্টর হয়তো বিদেশি মুদ্রা এনে দেয় না, কিন্ত বিদেশি মেহমানদের সেবা তো দেয়। ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তো হয়। সরকারকে তো হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্বের জোগান দেয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে হয়তো হিসেবে আসে না, তবে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই সেক্টরের অবদান নেহায়েত কম নয়। তাই এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় রেস্তোরাঁ সেক্টরকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারকে পাশে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নাই, কেননা বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারির যে ধাক্কা হোটেল রেস্তোরাঁ সেক্টরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তা সরকারের সহযোগিতা ছাড়া শুধু হোটেল রেস্তোরাঁ মালিকদের একার পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। বিশ্বের বহু দেশে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে সহযোগিতা দিচ্ছে সেসব দেশের সরকার। আমাদের দেশেও এই মুহূর্তে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোকে বাঁচানোর জন্য আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি রেস্তোরাঁ খোলা রাখার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, কমপক্ষে এক বছরের জন্য ঘরভাড়া অর্ধেক ও এক বছরের ভ্যাট মওকুফ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্তব্য
Loading...