শ্রদ্ধা ভালোবাসায় লুৎফর রহমানের চিরবিদায়

ছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় ও মুজিবনগর সরকারের ক্রীড়া সমিতির সম্পাদক

0 ৮৫

এমএ রাজা

মুক্তিযুদ্ধকালীন গড়া ৩৬ সদস্যের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য যশোরের লুৎফর রহমান (৬৯) চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে যশোর শহরের লোন অফিসপাড়ার নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন। বাদ আসর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন মাঠে জানাজা ও গার্ড অব অনার শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
মরহুমের ছেলে তানভীর রহমান জানান, তার বাবা লুৎফর রহমান ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ব্রেনস্ট্রোক করেন। এরপর থেকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যান। আসর বাদ যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন স্কুলমাঠে জানাজা ও গার্ড অব অনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লুৎফর রহমানের চিকিৎসায় এবং অন্যান্য সহযোগিতা বাবদ ৩০ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান করেছিলেন।
যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন মাঠে মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমানের গার্ড অব অনার প্রদান করেন সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকির হোসেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক নেতা খয়রাত হোসেন, আফজাল হোসেন দোদুল, হকি কোচ কাওসার আলী প্রমুখ। এছাড়াও যশোর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণকারী লুৎফর রহমান ছোটবেলা থেকেই ফুটবল এবং হকি খেলায় আগ্রহী ছিলেন। যশোর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবল খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান। তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যশোর জেলা ফুটবল দলের হয়ে নিয়মিত খেলায় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান বোর্ড দলের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মিলিত বোর্ডের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা ওয়ারী ক্লাবে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। তখন দেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত সৃষ্টিতে খেলোয়াড়দের ডাক দিয়ে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নিলেন কয়েকজন তরুণ আলী ইমাম, প্রতাপ, প্যাটেল, জাকারিয়া পিন্টু, আশরাফ ও মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে ভারতীয় মুদ্রার তিন লাখ টাকা তুলে তৎকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের কাছে দেন। ১৬টি খেলার মধ্যে ১২টি খেলায় জয়লাভ করেন। সব থেকে গৌরবময় খেলাটি ছিল ২৪ জুলাই ভারতের নদীয়া স্টেডিয়ামে। ওই দিন ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা। খেলোয়াড়রা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে তারা মাঠ যাবে। এরপর মাঠে আনুষ্ঠানিক বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার উত্তোলন করতে হবে। বিষয়টি নদীয়া ক্রীড়া সমিতিকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়। এই খেলাকে কেন্দ্র করে নদীয়া স্টেডিয়ামে ব্যাপক ফুটবলপ্রেমী জড়ো হয়েছিলেন। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলা বেতার মারফত খেলার বিষয়ে অবহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলা থেকে উৎসাহী ক্রীড়ামোদীরা বিপুল সংখ্যায় মাঠে সমবেত হন। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে। ভারতের সরকার তখন বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। খেলার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। কিন্তু পতাকা ও জাতীয় সংগীতের বিষয়ে নিষ্পত্তি ছাড়া বাংলাদেশের ফুটবল দল মাঠে নামবে না কিছুতেই। অবশেষে নদীয়ার জেলা প্রশাসক স্বপ্রণোদিত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়ে সম্মত হন। সেদিন পিন্টু-প্রতাপের হাতে ধরা মানচিত্রখচিত পতাকা উড়লো বিদেশের মাটিতে। এই খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথমবারের মত বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে অন্য একটি স্বাধীন দেশের পতাকার সমমর্যাদায় উত্তোলিত হয়। এ ঘটনার পর নদীয়ার জেলা প্রশাসক সাময়িক বরখাস্ত হন এবং নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাফিলিয়েশন বাতিল করা হয়। কিন্তু এ সংস্থার নজিরবিহীন ঘটনা রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে উৎসাহিত করে।

মন্তব্য
Loading...