শার্শা সীমান্ত দিয়ে অবাধে আসছে ফেনসিডিল-গাঁজা

0 ৮৬

বেনাপোল প্রতিনিধি

প্রতিদিন যশোর জেলার শার্শা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে অবাধে আসছে ফেনসিডিল ও গাঁজা। মহামারি করোনাভাইরাসের জন্য সীমান্ত দিয়ে অন্য পণ্য কম আসলেও থেমে নেই মরণ নেশা ফেনসিডিল আসা।
এই সীমান্তবর্তী দুটি থানার বিভিন্ন গ্রামের সীমান্ত দিয়ে মাদক আসছে বলে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। আর এর সাথে জড়িত রয়েছে এলাকার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিরা।

শার্শার শালকোনা, পাকশি, শিকারপুর, কায়বা, রুদ্রপুর, গোগা, অগ্রভুলোট, পাচভুলোট এবং বেনাপোলের গাতিপাড়া, দৌলতপুর, পুটখালী, সাদিপুর, রঘুনাথপুর ও ঘিবা সীমান্ত দিয়ে আসছে এসব অবৈধ মাদকদ্রব্য। দেশে মাদকসেবীদের যে চাহিদা আছে তার চেয়েও মাদক চোরাকারবারিরা বেশি বেশি আনছে সুযোগ বুঝে। এমনটি জানালেন শালকোনা গ্রামের সাবেক সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত হায়দার আলী।

শালকোনা গ্রামের হায়দার আলী বলেন, প্রচুর পরিমাণ ফেনসিডিল আসছে এবং যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে। আমি কার নাম বলব। আমাদের গ্রামে থাকতে হবে। কেউ না কেউতো ফেনসিডিল আনছে আবার ধরাও মাঝে মধ্যে পড়ছে। তিনি বলেন, দিনের বেলায়ও এ সীমান্তপথে মাদক আসতে দেখা গেছে। সীমান্ত পার হয়ে মাদক চলে যাওয়ার পর বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
তিনি বলেন, তাহলে তাদের সহযোগিতা ছাড়া কিভাবে এসব ফেনসিডিল প্রবেশ করে। তিনি আরো বলেন, এরসাথে জড়িত রয়েছে এক শ্রেণির জনপ্রতিনিধি ও তাদের আত্মীয়স্বজন।

ডিহি ইউনিয়নের বর্তমান মেম্বার তরিকুল ইসলাম তোতা বলেন, আমরা নাম বললে গ্রামে বসবাস করতে পারব না। আমাদের মতো অনেক জনপ্রতিনিধি আছে তারা এর সাথে জড়িত। ২৮ জুন ও শালকোনার এই সীমান্ত দিয়ে ৬০০ পিস ফেনসিডিল উঠেছে শুনেছি। বিজিবি দেখিয়েছে ৪৬০ পিস। বাকিটা কোথায়। যদি সোর্সকে দিয়ে থাকে তবে তাও তো ঠিক হবে না দেওয়া। কারণ ওই ফেনসিডিল সোর্স বিক্রি করে দিবে। এর ফলে উঠতি কিশোর-কিশোরীসহ যুবসমাজের অধঃপতন হবে।
একই এলাকার ফেনসিডিলের ‘জন’ (বহনকারী) উকিল হোসেন বলেন, আমি আগে জনে যেতাম। এখন যাই না। তবে এ পথে অনেকে মাদক ব্যবসা করে, আমি তাদের নাম বলতে পারব না। আমি নাম বললে বাড়ি থাকতে পারব না।
ডিহি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হোসেন আলী বলেন, মাদক ব্যবসার সাথে কোনো আপোশ নেই। যে ব্যবসা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার ইউনিয়নে একজন নাম করা মাদক ব্যবসায়ী আছে, আমি তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওই গ্রামের মনির ও উকিল সম্পর্কে তিনি বলেন, এরা আগে জনে যেত ও দুই চারটা বাড়িতে বিক্রি করত। এখন এরা ভালো হয়ে গেছে।
শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও কায়বা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, এই ইউনিয়নের রুদ্রপুর, দাতখালী ও কায়বার ৭০ ভাগ মানুষ ফেনসিডিল ব্যবসার সাথে জড়িত। এরা সীমান্তের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ফেনসিডিল নিয়ে আসে। মাঝে মধ্যে দুই একটি চালান আটক করলেও এর বড় অংশ চলে যায় দেশের অভ্যন্তরে।
অগ্রভুলোট দিয়ে সম্প্রতি বেশি আসছে ফেনসিডিল ও ইয়াবার চালান। ২৬ জুন প্রায় ১৪০০ পিস ইয়াবাসহ আবু সাইদ নামে একজন তরুণকে আটক করেছে বিজিবি। তবে ওই তরুণের সাথে আরো কে কে জড়িত আছে তাও খতিয়ে দেখার জন্য এলাকার লোকজন দাবি জানান।
স্থানীয় তবিবার রহমান মেম্বার বলেন, আমি কিভাবে বলব তার সাথে কে জড়িত আছে। বিজিবি তার নিকট ইয়াবা পেয়েছে সেই বিজিবিই উদ্ধার করতে পারবে এর সাথে কে জড়িত। তবে আবুল কালাম নামে এক যুবক বলেন, এই ইয়াবার সাথে তবিবুর রহমান মেম্বারের ভাই মাহবুুবুর রহমান জড়িত। এটা তারই মাল।
কালাম আরো বলেন, অগ্রভুলোট সীমান্ত বিজিবি ক্যাম্পের এফএস গিয়াস উদ্দিন তার নিকট টাকা চেয়েছে। সে বাড়ি এসে তার নিকট টাকা চেয়েছে বলেও দাবি করে। তিনি বলেন, মাহবুবুর ও শিমুল নামে দুজন ফেনসিডিল ব্যবসায়ীর প্রাইভেট ফেনসিডিল দিয়ে লোড করার সময়ও বিআইপি সাগর ও গিয়াস উপস্থিত ছিল কয়েকদিন আগে।
এ ব্যাপারে বিজিবির নিজস্ব গোয়েন্দা এফএস, এফআইজি গিয়াস উদ্দিন এর কাছে তার ০১৭৬৯৬২০১৭২ নম্বর মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি টাকা চাইব কেন? আমার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে যদি মিথ্যা কথা বলে আমার কিছু করার নেই।
এছাড়া বেনাপোলের ভবেরবেড় ফেনসিডিলের রাজধানী বলে পরিচিত। এখান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার কারণে এখানে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ফেনসিডিল ব্যবসা। এখান থেকে খুচরা ও পাইকারি নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ।
সাদীপুর সীমান্তের সাবেক জনপ্রতিনিধি সুলতান আহমেদ বাবু বলেন, মাদকের সাথে আমাদের কোনো আপোশ নেই। আমি নিজেও কয়েকবার এই সীমান্ত দিয়ে পার হয়ে আসলে মাদক ব্যবসায়িদের বিজিবির কাছে ধরিয়ে দিয়েছি। সম্প্রতি ১০০ বোতল ফেনসিডিল বেনাপোল আইসিপি ক্যাম্পে ধরিয়ে দিয়েছি।

উল্লেখ্য, ৬ জুন গোগা সীমান্ত থেকে ৮৬ পিস ফেনসিডিলসহ আটক হয় একজন ডাক্তার, এরপর ৯ জুন মেহেদী ও খালেদুর নামে দুজন আটক হয় ২২ বোতল ফেনসিডিলসহ পুটখালী সীমান্তে, একই দিন ভারত থেকে মালবাহী ট্রেনে আসা ওয়াগন থেকে বিজিবি ৬৬ বোতল ফেনিসিডিল উদ্ধার করে।
তবে সূত্র জানায়, ওই গাড়িতে ২৫০ বোতল ফেনসিডিল ছিল। ৭ জুন পুটখালী সীমান্ত থেকে ১১১ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে বিজিবি। ১০ জুন ৫১ বোতল ফেনসিডিলসহ বেলাল নামে একজনকে আটক করে বিজিবি। ১১ জুন ৯৪ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে বিজিবি সাদিপুর সীমান্ত থেকে। ১৪ জুন ৬ কেজি গাজা উদ্ধার করে বিজিবি সাদিপুর সীমান্ত থেকে। ১৭ জুন বেনাপোলের কাগমারী থেকে একটি মোটরসাইকেলসহ সিরাজুল নামে একজনকে পুলিশ আটক করে। ২২ জুন ২ কেজি গাঁজা সহ শফিকুল নামে একজনকে কাশিপুর সীমান্ত থেকে আটক করে বিজিবি। ২৬ জুন ৭০০ গ্রাম গাঁজাসহ মালেক নামে একজনকে আটক করে পোর্ট থানা পুলিশ। ২৮ জুন শার্শার শালকোনা থেকে ৪৬০ পিস ফেনসিডিল উদ্ধার করে বিজিবি। তবে সেখানে ৬০০ পিস ফেনসিডিল ছিল বলে এলাকার একটি সূত্র জানায়।

সূত্রমতে, সীমান্ত এলাকায় ছাড় পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা এখন প্রয়োজনের চেয়ে ফেনসিডিল এনে জমা করছে। পরে এগুলো অধিক দামে বিক্রি করবে।

মন্তব্য
Loading...