উপচেপড়া ভিড়ে স্বাস্থ্যবিধি লাটে

২৮১

রাজু আহমেদ

যশোরে রাস্তা, অফিস, হাসপাতাল ও বাজারগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। কেউ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। তাদের ঘেষাঘেষি ভিড় ও চলাচল করতে দেখে মনে হয় যেন দেশ থেকে করোনাভাইরাস বিদায় নিয়েছে! কারো যেন সামাজিক দূরত্বের কথা মনেই নেই! মঙ্গলবার শহরের সব জায়গায় ছিল মানুষের ভিড়। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা না করেই মানুষ কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন লক্ষ্মণই ছিল না তাদের মধ্যে। সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
এই জেলায় করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। রোগী সংখ্যা বাড়লেও সামাজিক দূরত্ব মানছেন না সাধারণ মানুষ। মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় এবং হাটবাজারে দিব্যি কেনাকাটায় ব্যস্ত লোকজন। রাস্তায় বাস, অটোরিকশা, ইজিবাইক চলছে সমানতালে। কোথাও সামাজিক দূরত্ব মানার বালাই নেই।
মঙ্গলবার সকালে শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও টাউন হল মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা ছিল লকডাউনের দিনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। গা ঘেষাগেষি অবস্থা! সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা তো দূরের কথা, অনেকে মাস্ক ছাড়াই চলে এসেছেন বাজারে।
সবজি বিক্রেতা সোহেল মিয়া বলেন, চরম গরম পড়ছে। রোদে মাথার চান্দি পর্যন্ত গরম হয়ে গেছে। গরমে মাস্ক ব্যবহার করা অনেক কষ্টকর। সঙ্গেই আছে, পকেটে রেখে দিয়েছি। তাই মাস্ক সঙ্গে থাকলেও ব্যবহার করছি না। তবে মাঝে মধ্যে ব্যবহার করি।
যশোর প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো মানুষের ভিড়। প্রধান ফটকের সামনে, অফিসের নিচের তলায়, রাইটিং টেবিল, সিড়ি ও অফিসের দ্বিতীয় তলায় মানুষের ব্যাপক ভিড়। সেখানে মানুষের বেশির ভাগেরই মুখে মাস্ক ছিল না। একজনের শরীরের সাথে অন্যজনের দূরত্ব নেই। গায়ের সাথে গা লাগিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা গ্রহণ করছেন।
সেখানে সেবা নিতে আসা আনিকা তানিজিলা বলেন, হাজার হাজার মানুষের ভিড়। চাইলেও দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করা সম্ভব না। অফিসের ভিতর মানুষের গাদা ভিড়। নিচ তলা থেকে উপর তলা পর্যন্ত লাইন। ধাক্কাধাক্কি আর ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়ে আছি। কি আর করা আছে! কাজ তো সারতে হবে। খুব ভয় করছে। না জানি করোনা হয়ে যায়। কারণ অনেকে মুখের উপর হাঁচি-কাশি দিচ্ছে।
শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও টাউন হল মাঠ বাজার, ডাকঘর অফিসের মতো শহরের অন্যান্য রাস্তা, অফিস, হাসপাতাল, বাস কাউন্টার, টার্মিনাল ও বাজারগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই সবাই কাজ করছেন, চলাচল করছেন, একস্থান থেকে অন্যস্থানে গনপরিবহনে যাওয়া-আসা করছেন। ঢাকা, নড়াইল, মনিরামপুর, কেশবপুর, বেনাপোল, খুলনা, কুষ্টিয়াগামী বাসগুলোতে নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। সেই সাথে যাত্রীদের অভিযোগ দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়ার। তবে বিভিন্ন জায়গায় এসব বিষয়ে মনিটরিং করতে পুলিশ বাহিনীকে দেখা গেছে।
বাসযাত্রী মাহাবুল ইসলাম জানান, ভাড়া বেশী নিচ্ছে। আর বাসের মধ্যে বেশি গরম। মাস্ক ব্যবহার করলে আরও বেশি গরম অনুভূত হয়। তাই মাস্ক খুলে রেখেছি। বাস থেকে নেমে আবারও মাস্ক ব্যবহার করবো।
সরেজমিনে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে দেখা যায়, রোগী, দর্শনার্থী, দালালসহ শতশত মানুষের ব্যাপক ভিড়। সেখানে কেউ সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। মানছেন না অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি। মানুষের ভিড় দুহাতে ঠেলে সেবা নিতে ব্যস্ত ছিলেন সবাই। সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় হাসপাতালের টিকেট কাউন্টার, বহিঃবিভাগ, ফার্মেসি ও প্যাথলজী বিভাগে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মাস্ক ব্যবহারের জন্য মানুষকে সচেতন করার জন্য কাজ করছে যশোর স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না। যদিও এ ধরণের প্রচারণা দেখা যায়নি ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল।
এ বিষয়ে যশোরের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আরিফ আহমেদ বলেন, সব মিলিয়ে আমরা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই এখন করোনা আতঙ্কে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনদের উদাসিনতা দেখে খুব ভয়ে-ভয়ে কাজ করছে। কারণ কেউ সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। অনেকে মুখে মাস্ক পর্যন্ত ব্যবহার করছেন না। লকডাউন তুলে দেওয়ায় মানুষের ভিড় বেড়েছে বহুগুণ। তার সাথেসাথে আতঙ্ক বেড়েছে কয়েকগুণ। রোগীদের উদাসিনতা বা স্বাস্থ্যবিধি না মানায় খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছি। করোনার মতো স্পর্শকাতর ও অধিক ছোঁয়াছে রোগ। বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাধারণ রোগীদের অসাবধানতায় চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও রোগীর স্বজনরা। আমরা কোনভাবেই রোগী ও দর্শনার্থীদের সচেতন করতে পারছি না।
সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন বলেন, আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সব সময়ই মানুষের সচেতনতার জন্য মাইকিং করছি। শহরের বিভিন্ন বাজার ও মোড় গুলোতে টহল দিচ্ছি। সবাইকে সচেতন করছি। সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে এবং অকারণে ঘর থেকে বের না হয় সেজন্য নিয়মিত বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালাচ্ছি। আর মাস্ক ব্যবহারের কোনও বিকল্প নেই। মানুষ যাতে সরকারি সকল নির্দেশনা মেনে চলে সেজন্য যশোর সিভিল সার্জন অফিসের সবাই কাজ করে যাচ্ছেন। সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে বলা হচ্ছে। তবে কেউ যদি নির্দেশনা অমান্য করেন। সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। আমাদের সব ধরণের প্রস্তুতি আছে, তবে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। সবাইকে মাস্ক পরতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বেশী বেশী বজায় রাখতে হবে।

মন্তব্য
Loading...