বাংলাদেশে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা রোগী

৭১
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস যখন বিশ্বনেতাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তখন বাংলাদেশেও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অদৃশ্য শত্রু। দেশে গত ১৫ দিনে করোনারোগী দ্বিগুণেরও বেশি শনাক্ত হয়েছে। ৮ মার্চ আইইডিসিআর এর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বাংলাদেশে প্রথম করোনভাইরাস শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অর্থাৎ আটই মার্চ শনাক্ত শুরুর পর এক মাস ২২ দিন পর পহেলা মে এসে মোট শনাক্ত দাঁড়ায় আট হাজারে। কিন্তু এরপর এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে সময় লেগেছে মাত্র ১৫ দিন।
গত ২৪ ঘণ্টায় (১৫ মে ২০২০ সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে নতুন করে আরও ১২০২ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬৫ জনে।
গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে ২৯৮ জন মারা গেছেন।
১৫ মে ২০২০ দুপুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা এ তথ্য জানান।
দেশে প্রথম যে তিনজন ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির কথা জানা যায় তারা একই পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং এর মধ্যে দুইজন ইতালি থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
এরপরের কয়েকদিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই, তিন বা চার জন করে। এরপর আটই এপ্রিল রোগী পাওয়া যায ৫৪ জন এবং পরদিন নয়ই এপ্রিল তা ১০০ ছাড়িয়ে যায়।
আবার কয়েকদিন শনাক্তের সংখ্যা কম বেশি হলেও ১২ এপ্রিল ১৩৯ জন, চৌদ্দ এপ্রিল ২০৯ জন, বিশে এপ্রিল ৪৯২ জন, চব্বিশে এপ্রিল ৫০৩, ২৯ এপ্রিল ৬৪১ জন শনাক্তের খবর দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ।
পরে ল্যাবরেটরির সংখ্যা অর্থাৎ নমুনা পরীক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে ঊর্ধ্বমুখী হয় শনাক্তের সংখ্যাও। এগারই মে প্রথমবারের হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয় একদিনে।
অন্যদিকে মোট আক্রান্তের হিসেব দেখলে দেখা যায় ছয় এপ্রিল আক্রান্ত ছিল ১২৩ জন। এর মাত্র বারো দিন পর ১৮ই এপ্রিল মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াায় ২ হাজার ১৪৪ জনে। এর মাত্র আটদিনের মধ্যে ছাব্বিশে এপ্রিল মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪১৬ জনে।
আবার পহেলা মে রোগীর সংখ্যা ৮২৩৮ হলে এরপরের চৌদ্দ দিন অর্থাৎ ১৪ মে নাগাদ রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৩ জনে।
তাহলে এখন প্রশ্ন আসছে যে সংক্রমণের পিক টাইম বা চূড়ায় যেতে কতদিন সময় লাগতে পারে।
বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেছেন, সপ্তাহ দেড়েক আগের যে পরিস্থিতি ছিল তা দেখে কিছু রোগতত্ত্ববিদ ধারণা করেছিলেন মে মাসের শেষ দিকে বা জুনের প্রথম দিকে সংক্রমণ শীর্ষবিন্দু বা পিকে পৌঁছাবে। কিন্তু এখন শিথিলতার কারণে সেটা পিছিয়ে যাবে।
‘এখন পর্যন্ত অনেক গুচ্ছ সংক্রমণ হচ্ছে তবে কোনো এলাকায় অনেক বেশি লোক সংক্রমিত নেই। সেরকম অনেক বেশি সংক্রমণের বিস্ফোরণ হলে শীর্ষবিন্দু এগিয়ে আসবে কিন্তু নেমে যেতে সময় লাগবে’।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিউইয়র্কের মতো হলে পিক টাইম এগিয়ে আসবে তবে কমতে সময় লাগবে।
মিস্টার হোসেন বলেন, শীর্ষবিন্দু পার হলেই কেবল বোঝা যাবে যে, এটি পার হলাম, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত বলা মুশকিল। কারণ ঈদকে সামনে রেখে মানুষ কতটা শৈথিল্য দেখাচ্ছে বা কতটুকু বিধিনিষেধ মানছে তার ওপর সেটা নির্ভর করবে।
‘সময়টা পরিবর্তনশীল। বাংলাদেশে মৃদু সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। হয়তো অনেকে বেশি অসুস্থ হলে হাসপাতালে আসতো। তবে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে উপচেপড়া ভিড় নেই’।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) বেনজীর আহমেদ বলছেন, পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তার ওপর।
‘অনেক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে পিক টাইম আসাটা। যে দেশ যেভাবে রেসপন্ড করেছে, বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে তার ওপর ভিত্তি করেই সেখানে সংক্রমণ পিকে এসেছে’।
তিনি বলেন, কোনো দেশ দ্রুত আবার কোনো দেশ ব্যবস্থা বিলম্বে নিয়েছে। যেমন চীন আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছিল লকডাউন, আইসোলেশন কার্যকরী করতে। ফলে সেখানে দ্রুত এসেছে। অন্যদিকে ইতালিতে অনেক দেরিতে এসেছে পিক টাইম এবং যুক্তরাষ্ট্রে এখনো এসেছে বলে মনে হয় না।
মিস্টার আহমেদ বলেন, দেশগুলোর আচরণের ওপর নির্ভর করে পিক টাইম। বাংলাদেশে এখনকার উল্লম্ফনের কারণ হলো গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথাযথ কার্যকর না হওয়া ও পর্যাপ্ত পরীক্ষার অভাব।
‘সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও টেস্ট ব্যাপক হলে মে মাসের শুরুতে পিক টাইম আসার ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে গার্মেন্টস, দোকানপাট খুলে দেয়া হলো এবং যথাযথ লকডাউন না মানায় তা এখন বাড়ছে। সীমিত আকারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনও হচ্ছে’।
ব্যাপক না হলেও কোনো কমিউনিটিতে মধ্যম মানের ট্রান্সমিশন হয়েছে যেমন ঢাকা নারায়ণগঞ্জ ও সম্প্রতি চট্টগ্রাম। যদিও এখনো আশি ভাগ কমিউনিটি করোনামুক্ত। লকডাউন বাড়ানো না হলে এসব জায়গায় ছড়াতো।
‘তাই সব মিলিয়ে বিষয়টি আমাদের ওপরই নির্ভর করেছ। মে মাসের পরে লকডাউন উঠে গেলে বা সব খুলে গেলে তখন সব একাকার হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পিক টাইম নির্ভর করবে এসব ব্যবস্থার ওপর। চূড়াটাই বা কত বড় হবে অর্থাৎ কত মানুষ আক্রান্ত হবে সেটাও একটা বিষয়’।
তিনি বলেন, ‘তবে সব খুলে দেয়া হলে এবং সব একাকার হয়ে গেলে সংক্রমণের পিক বা চূড়া আসাটা প্রলম্বিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী চক্র তৈরি হবে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গরিব মানুষেরা।
এদিকে অদৃশ্য প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) এর ভয়াল থাবায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে গোটাবিশ্ব। প্রতি মুহূর্তেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে সংক্রমিত ও মৃত্যুর সংখ্যা।
করোনা মহামারির সার্বক্ষণিক তথ্য প্রকাশ করছে ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফো। এই ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, ১৪ মে ২০২০ জিএমটি ০৯.১৩টায় এ ভাইরাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৬১। মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ৭০৭। আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮৮৩ জন। আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৮৫ শতাংশ এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫ শতাংশ।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত আট দেশেও এ ভাইরাসের করালগ্রাসে প্রতিনিয়ত সংক্রমিতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফো ওয়েবসাইটের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সার্কভুক্ত দেশগুলোর করোনা চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
সার্কভুক্ত আটটি দেশের মধ্যে ভারতে সংক্রমিত ও মৃতের সংখ্যা সবচাইতে বেশি। অন্যদিকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভুটান।
ভারতে মোট আক্রান্ত ৮২ হাজার ২৬৮, মৃত্যু ২ হাজার ৬৪৯, সুস্থ ২৮ হাজার ০৮৬ জন।
আক্রান্তের দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পাকিন্তান। এদেশে মোট আক্রান্ত ৩৭ হাজার ২১৮, মৃত্যু ৮০৩, সুস্থ ১০ হাজার ১৫৫ জন।
আক্রান্তের তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মোট আক্রান্ত ২০ হাজার ৬৫, মৃত্যু ২৮৯ এবং এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৩,৮৮২ জন।
আক্রান্তের চতুর্থ অবস্থানে আছে আফগানস্তান। এদেশে মোট আক্রান্ত ৬ হাজার ৫৩, মৃত্যু ১৫৩, সুস্থ ৭৪৫ জন।
পঞ্চম স্থানে মালদ্বীপে মোট আক্রান্ত ৯৮২, মৃত্যু ৪ জন, সুস্থ ৪৫ জন।
ষষ্ঠ স্থানে শ্রীলঙ্কায় মোট আক্রান্ত ৯২৫, মৃত্যু ৯, সুস্থ ৪৭৭ জন।
সপ্তম স্থানে নেপাল। এ দেশে মোট আক্রান্ত ২৫৮, মৃত্যু নেই, সুস্থ ৩৫ জন।
এবং অষ্টম স্থানে ভুটানে মোট আক্রান্ত ২১, মৃত্যু নেই, সুস্থ ৫ জন।
পিকে/প্রণব/তুহিন

মন্তব্য
Loading...