করোনা সংকটে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন মাঠে

৮৪

ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল

চলমান করোনা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোরস্থ ৫৫ পদাতিক ডিভিশন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে ব্যাপক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার মতো কার্যক্রম দিয়ে শুরু হয়ে দফায় দফায় তাদের কাজের সম্প্রসারণ হয়েছে। আর তা হয়েছে মানবিক সহায়তা থেকে প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে প্রচেষ্টা পর্যন্ত।
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বৈশ্বিক এ দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। শুরু থেকেই সেনাসদস্যরা তৎপর হয়ে ওঠে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। মানুষের অযথা বাইরে ঘোরাফেরা না করা, বাজারের সামনে হট্টগোল কমিয়ে আনার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সেনাসদস্যরা কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং পোস্ট স্থাপন করে পথচারীদের জীবাণুমুক্ত করা এবং মাস্ক বিতরণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়।
মাসাধিককাল এমন প্রয়াসের পর তাদের দেখা যায় আরেক কর্মযজ্ঞে। নিজেদের রেশন বিলিয়ে দিতে থাকেন করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমজীবী, প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে। রাতের অন্ধকারে, মুষলধারে নেমে আসা বৃষ্টির মধ্যে প্রত্যন্ত গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে সেনাসদস্যরা শত শত পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। অভাবিত এমন সহযোগিতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন গ্রামের অতি সাধারণ মানুষ।
সেনাবাহিনীর যশোর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের কর্মকর্তা লে. কর্নেল নেয়ামুল হক জানান, করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষেরা যেন অভুক্ত না থাকে, সেজন্য তাদের এ উদ্যোগ। খাদ্য সহায়তার তালিকায় আসেননি গ্রামাঞ্চলের এমন পরিবারকে চিহ্নিত করে তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এসব খাবার রাতে বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এপ্রিল মাসের প্রথমদিকে শুরু হয় এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ। প্রতি সপ্তাহে একহাজার পরিবারকে এই সহায়তা দেয়া হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাসদস্যদের রেশন ও কর্মকর্তাদের আর্থিক সহায়তায় এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি সেনাসদস্যরা শুরু করেন আরেক সংগ্রাম। গ্রীষ্মকালীন সবজির ভরা মওসুমে পরিবহন আর পাইকারদের সংকটে চাষিরা পড়েছেন মহাবিপর্যয়ে। তাদের বিপর্যয় কাটাতে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি মাঠ থেকে সবজি ক্রয় শুরু করেছেন তারা। যশোর সেনানিবাসের ক্যাপ্টেন ফাইজুল আলিফ জানান, যশোরসহ এ অঞ্চলের কৃষকের বড় একটি অংশ সবজি চাষে সম্পৃক্ত। কিন্তু করোনাদুর্যোগে তারা এখন লোকসানের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে যশোর সেনানিবাসের ৪০টি ইউনিট প্রতিদিন তাদের প্রয়োজনীয় সবজি সরাসরি মাঠে গিয়ে কৃষকের কাছ থেকে কিনছেন।
এদিকে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার বাস্তবায়নেও সেনাসদস্যরা নিয়োজিত করেছেন নিজেদের। বিভিন্ন ধরনের শস্য, সবজি ও ফলের বীজ প্রান্তিক চাষিদের পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। লে. কর্নেল নেয়ামুল হক বলেন, খাদ্যসহায়তার সময় যেসব মানুষের বাড়ির আঙিনায় ফাঁকা জমি দেখছেন, সেনাসদস্যরা তাদেরকেই উদ্বুদ্ধ করছেন তা অনাবাদি না রাখতে। আর প্রয়োজন মতো বীজ তুলে দিচ্ছেন তাদের হাতে। তিনি বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হতে পারে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের। আর এ সংকট মোকাবিলার জন্যই এ উদ্যোগ। চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাহিনীর এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোরস্থ ৫৫ পদাতিক ডিভিশন খুলনা ও ঢাকা বিভাগের ১০টি জেলায় মানবিক সহায়তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জেলা ১০টি হচ্ছে যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ি।

মন্তব্য
Loading...