সাংবাদিক কাজলকে হ্যান্ডকাপ, সমালোচনার ঝড়

৮২৯
নিজস্ব প্রতিবেদক ও বেনাপোল প্রতিনিধি

যশোরের বেনাপোলের সীমান্ত থেকে ঢাকার নিখোঁজ ফটোসাংবাদিক ও পক্ষকাল পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলকে পিঠমোড়া দিয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। চলছে সমালোচনার ঝড়। অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ ও ৫৪ ধারার মামলায় তাকে আটক দেখিয়ে রোববার বিকেলে যশোরের শার্শা আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে তোলা হয়। বিচারক অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ মামলায় জামিন দিলেও ৫৪ ধারার মামলায় তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এ প্রসঙ্গে বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন খান বলেন, ‘হাতকড়া আসামির থাকতেই পারে। এটা তো নিয়ম আছে। আইনের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। আইনী প্রক্রিয়ায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজিবি উদ্ধার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। বিজিবি যেভাবে আমাদের কাছে দিয়েছে, সেটি দেখলে তো, আপনারা আরও ক্ষেপে যেতেন। আমরা আইনের মধ্যে থেকে যতটুকু সম্ভব করেছি।’
দৈনিক পক্ষকাল পত্রিকার সম্পাদক ও ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল মেহেরপুর সদর উপজেলার কাশারীপুর গ্রামে মনোয়ার হোসেনের ছেলে। তার বর্তমান ঠিকানা ঢাকার ১৩/২ বকশীবাজার। তার বিরুদ্ধে বেনাপোল পোর্ট থানায় ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট আদেশ আইনের ১১(৩) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ১০ মার্চ তিনি ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন। পরিবারের দাবি, তাকে অপহরণ করা হয়েছে।
অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ মামলার বাদী ৪৯ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বেনাপোলের রঘুনাথপুর বিজিবি ক্যাম্পের হাবিলদার মো. আশেক আলী এজাহারে উল্লেখ করেছেন, শনিবার (৩ মে) রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে বিজিবি ফোর্স রঘুনাথপুর এলাকায় নিয়মিত টহলে ছিল। রাত পৌনে ১টার দিকে রঘুনাথপুর গ্রামের মেইন পিলার থেকে একশ’ গজ অভ্যন্তরে শফিকুল ইসলাম কাজল পায়ে হেঁটে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিজিবি টহল দল আটক করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয় দেন। তার নাম ঠিকানা ও সাংবাদিক পরিচয় দেন। অবৈধভাবে বিনা পাসপোর্টে ভারতীয় দালালের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছিল বলে স্বীকার করেন।
তার বিরুদ্ধে বেনাপোল পোর্ট থানায় ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট আদেশ আইনের ১১(৩) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নম্বর ৫। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা দিয়ে তাকে গভীর রাতে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করে বিজিবি। রোববার দুপুরে বেনাপোল থেকে এনে তাকে যশোর ডিএসবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বিকেল ৩টার দিকে যশোর ডিএসবি কার্যালয় থেকে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয় ফটোসাংবাদিক ও দৈনিক পক্ষকালের সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলকে। এসময় তিনি মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন। আদালত প্রাঙ্গণে তার ছেলে মনোরম পলক তাকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় কাজলের চোখ অশ্রæসজল হয়ে ওঠে। শফিকুল ইসলাম কাজল তার ছেলেকে বলেন, ‘ভয় পাসনে, আমি কোনো অন্যায় করিনি। সত্যের জয় হবেই।’
আদালত সূত্র জানায়, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের অভিযোগে ১১(সি) ধারায় আটক দেখিয়ে যশোরের শার্শা আমলি আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে ৫৪ ধারায়ও আটক দেখানো হয়েছে।
যশোরের আমলি আদালতের (শার্শা) বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে বিজিবির দায়ের করা অবৈধ অনুপ্রবেশ মামলায় জামিন দেন। তবে যশোর কোতোয়ালি থানার ৫৪ ধারায় দায়ের করা অপর একটি মামলায় তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। কারাগারে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে জানিয়েছেন কাজলের আইনজীবী সুদীপ্ত ঘোষ।
কাজলের ছেলে মনোরম পলক বলেন, বাবাকে ফিরে পেয়েছি এতে অনেক খুশি। বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। একইসাথে পিতার দ্রæত জামিনের দাবিও করেছেন তিনি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যুব মহিলালীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেল কেন্দ্রিক কারবারে জড়িতদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তাতে আসামির তালিকায় শফিকুল ইসলাম কাজলের নামও রয়েছে। মাগুরা-১ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর গত ৯ মার্চ শেরেবাংলা নগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই মামলাটি করেন।

এদিকে সাংবাদিক কাজলকে হাত পিছনে দিয়ে হ্যান্ডকাপ পরানো ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। চলছে সমালোচনার ঝড়। সাংবাদিক ও সচেতন মানুষ সমালোচনা করেন। অনেকে তার অপরাধ জানতে চান। যুদ্ধাপরাধীদেরও এমনভাবে হাতকড়া পরানো হয়নি বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান।
সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল গত ১০ মার্চ সন্ধ্যায় দৈনিক পক্ষকাল অফিস থেকে বের হন। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে পরদিন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী নয়ন। পরে ১৮ মার্চ রাতে কাজলকে অপহরণ করা হয়েছে অভিযোগ এনে চকবাজার থানায় মামলা করেন তার ছেলে মনোরম পলক।

আনিছুর/ইন্দ্র/তুহিন

মন্তব্য
Loading...