২৫ মার্চের কালরাত

0 ২০

স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানিদের অত্যাচর নির্যাতনের জলন্ত প্রমাণ ১০৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত। এ রাতে ঘুমন্ত জাতির ওপর পাকিস্তানি হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল অসংখ্য মানুষকে। সে রাতে অন্তত ১০ হাজার মানুষ হানাদারদের বুলেটের আঘাতে শহিদ হয়েছিলেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ রাতটি শোকাবহ রাত হিসেবে চিহ্নিত। অন্য দিকে এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে জাতি শুরু করেছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। যে মুক্তিযুদ্ধের সফল সমাপ্তি ঘটে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে।
দেশজুড়ে সে সময় চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। সবার মুখে কেবল একটিই শ্লোগান ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা,’ এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশলাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, নিউমার্কেট, ঠাটারি বাজার, পুরান ঢাকা, ফরাশগঞ্জ, বিকে দাস লেন, শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার, ভোলাগিরি আশ্রম, অভয়দাশ লেন, টিকাটুলি, হাটখোলা, আরকে মিশন রোড, গেন্ডারিয়া সাধনা ঔষধালয়সহ বিভিন্ন এলাকা। সংবাদপত্র অফিসের মধ্যে লক্ষ্য ছিল ‘ডেইলি পিপলস, ইত্তেফাক ও সংবাদ।’ যে ১০ হাজার মানুষ মারা যায় তার মধ্যে ছিল রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের ৫ শতাধিক পুলিশ ও ৩ শতাধিক নিরীহ শিক্ষার্থী।
মধ্যরাতে পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলো কামান উঁচিয়ে ঢুকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সঙ্গে লরি বোঝাই সৈন্য। প্রথমে তারা গুলি চালায় ইকবাল হলে। এতে মারা যান শতাধিক ছাত্র। এরপর জগন্নাথ হলে ঢুকে সাব-মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে আরও দেড় শতাধিক ছাত্র-শিক্ষককে। রোকেয়া হলও আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি। গুলি চালিয়ে তারা হত্যা করে অনেক ছাত্রীকে। কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচান। মেডিকেল কলেজ এবং হোস্টেলেও গুলি করে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে হায়েনার দল।
এসব ঘটনা যখন ঘটছিল, তখন সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাঙ্ক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে। এরপর তারা ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। ভোর ৫টার পর পাকিবাহিনী গোলার আঘাতে উড়িয়ে দেয় কেন্দ্রীয় শহিদমিনার। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা যেন এক নিস্তব্ধ নগরীতে রূপ নেয়। চারিদিকে শুধু চলতে থাকে লাশ আর স্বজনের কান্নার মিছিল। পাকিস্তানিদের নির্মমতার স্বাক্ষর এই কালরাত বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে মুছবে না।

মন্তব্য
Loading...