আমন সংগ্রহ : মণিরামপুরে চাষিদের পরিবর্তে লাভবান মধ্যসত্বভোগী

৭৫

প্রবীর কুন্ডু, মণিরামপুর : যশোরের মণিরামপুরে ন্যায্যমূল্যে আমন সংগ্রহে চাষিদের পরিবর্তে লাভবান হচ্ছেন মধ্যসত্বভোগীরা। আমনের মৌসুম বেশ আগেই শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে বোরো আবাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বর্তমান চাষিদের ঘরে আমন ধান নেই বললেই চলে। ফলে আমন সংগ্রহের তালিকাভুক্ত চাষিদের কাছ থেকে এলাকার মধ্যসত্বভোগীরা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করে বাজার থেকে কম মূল্যে ধান ক্রয়ের পর সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করছেন বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আর একাজে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে এলাকার বেশ কয়েকজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) মনিরুজ্জামান মুন্না জানান, মণিরামপুরে এবার আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৫৩১ মে.টন। কৃষি অফিসের প্রস্তুতকৃত ৪৫ হাজার চাষির মধ্যে লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছে দুই হাজার ১৫০ জনকে। এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে প্রতি চাষির কাছ থেকে এক থেকে দেড় মে.টন ধান সংগ্রহের উদ্বোধন করা হয় ১২ ডিসেম্বর। নিয়ম রয়েছে কার্ডধারী যেসব চাষি চলতি মৌসুমে আমন চাষ করেছেন শুধুমাত্র সেইসব চাষির নাম ক্রয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্তরা সঠিকভাবে যাচাইবাছাই না করে গোজামিল দিয়ে তড়িঘড়ি করে তালিকা প্রস্তুত করায় ভুয়া নামের ছড়াছড়ি হয়েছে। তার ওপর প্রকৃত চাষিদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
অন্যদিকে আমন মৌসুম বেশ আগেই শেষ হয়েছে। ফলে বর্তমান অধিকাংশ চাষির ঘরে ধান নেই। তার ওপর আমন চাষির তালিকায় রয়েছে ভুয়া নামের ছড়াছড়ি। আর এ সুযোগে মধ্যসত্বভোগীরা মাঠে নেমে পড়েছেন চাষিদের কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, ইতিমধ্যে মধ্যসত্বভোগী একটি সিন্ডিকেট এলাকার অধিকাংশ উপসহকারী কৃষি অফিসারদের ব্যবহার করে চাষিদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিকার্ড সংগ্রহের পর নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর আদায় করছেন।
সরেজমিন জানা যায়, উপজেলার কোড়ামারা, পাঁববাড়িয়া, পাঁচকাটিয়া, চান্দুয়া, বাহাদুরপুর, মাহমুদকাটি, রঘুনাথপুর, কদমবাড়িয়া, শেখপাড়া রোহিতা, সরনপুর, শ্যামকুড়, লাউড়ী, হেলাঞ্চী, কৃঞ্চবাটি, ভোজগাতী, জয়পুর, ঢাকুরিয়া, জুড়ানপুর, গাংড়াসহ অধিকাংশ গ্রামে তালিকাভুক্ত আমন চাষিদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোড়ামারা গ্রামের তালিকাভুক্ত চাষি সুনিল সরকার, নিরোধ সরকার, সুভাষ সরকার, অরুন বিশ্বাস, সুকৃতি বিশ্বাস ও দেবপ্রসাদ সরকারের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের সাধারণ উপকারভোগী (সিআইজি) দলের নেত্রী রমা সরকার এবং শংকর সরকার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া নির্ধারিত ফরমে ওইসব চাষির স্বাক্ষর আদায় করা হয়েছে। সুনিল সরকার অথবা নিরোধ সরকারই নয়, এমন অভিযোগ করেন ওই গ্রামের নারায়ন, অভিমান্য সরকার, অনিমেষ সরকার, দুলাল সরকার, প্রভাষ সরকার, শংকর সরকার, সুফল সরকার, অমর সরকার, তারাপদ বিশ্বাসসহ অর্ধশতাধিক চাষি। সিআইজির দলনেত্রী রমা সরকার এসব চাষির কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ এবং ফরমে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ার সত্যতা স্বীকার করেন।
তিনি জানান, স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ভবেন্দ্র নাথ মল্লিকের নির্দেশনা মোতাবেক তিনি কার্ড সংগ্রহের পর তার (ভবেন্দ্র নাথ) কাছে জমা দিয়েছেন। আর ভবেন্দ্র নাথ মল্লিক ওই কার্ড তুলে দিয়েছেন মধ্যসত্বভোগী সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে। পরে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাজার থেকে কম মূল্যে (ছয়শ টাকা মণপ্রতি) ধান ক্রয়ের পর ওই সব কৃষিকার্ড এবং স্বাক্ষর করা ফরম নিয়ে সরকারি খদ্যগুদামে এক হাজার চল্লিশ টাকা মণপ্রতি ধান সরবরাহ করছেন।
তবে ভবেন্দ্র নাথ মল্লিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কোনো চাষির কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করেননি। একই অভিযোগ উঠেছে হরিদাসকাটির উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত বিশ্বাস, খেদাপাড়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন ও তুহিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। তবে তারাও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হীরক কুমার সরকার এবং আমন ক্রয় কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী জানান, অভিযোগের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

মন্তব্য
Loading...