চৌগাছায় সাতজন নিখোঁজের ৭ বছর পর মামলা : আটক ১

৬৪

চৌগাছা পৌর প্রতিনিধি : যশোরের চৌগাছায় দালালের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘ প্রায় সাত বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছে একই পরিবারের চারজনসহ সাত ব্যক্তি। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে তারা আর ফেরেননি।
ঘটনার প্রায় সাত বছর পর রোববার রাতে এক দালালকে চৌগাছা শহর থেকে ধরে পুলিশে দিয়েছে জনতা। রোববার রাতেই নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুলের পিতা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭ ধারায় একটি মামলা করেছেন। পুলিশ এ মামলায় পরিবারের লোকদের হাতে আটক দালাল ফজলুর রহমান রাজুকে (৪৮) গ্রেফতার করে।
চৌগাছা থানায় দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের একই পরিবারের আতিয়ার রহমানের ছেলে অমিত হাসান মুকুল (৩০), হায়দার আলীর ছেলে আজিজুর রহমান (৪০), মৃত বদর উদ্দিনের ছেলে ফুলজার হোসেন (৪৬), মৃত ছবেদ আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম খোকন (৪০) নিখোঁজ রয়েছেন। একই গ্রামের মৃত আত্তাপ হোসেনের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৭), রোস্তমপুর গ্রামের মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে রমজান আলী (৪৫) ও ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের উমসান আলীর ছেলে লিটন হোসেন (২৭) ২০১৩ সালের ১ জুন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা না ফেরায় নিখোঁজদের সাত পরিবারে নেমে এসেছে চরম হতাশা। উৎসব-পার্বণ এলেই কান্নার রোল পড়ে যায় বাড়িগুলোতে। দীর্ঘদিন বাড়ির অভিভাবকরা নিখোঁজ থাকায় চরম দারিদ্র গ্রাস করেছে পরিবারগুলোকে। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। এক পর্যায়ে নিখোঁজ ফুলজার হোসেনের স্ত্রী রূপভান দুই মেয়ে এবং শরিফুলের স্ত্রী রেশমা বেগম তিন মেয়ের ভরণপোষণের জন্যে স্থানীয় ডিভাইন গার্মেন্টসে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
অল্প টাকায় (জনপ্রতি ৩ লাখ টাকায়) মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রলোভনে দরিদ্র পরিবারের এসব ব্যক্তিরা আদম ব্যাপারির খপ্পড়ে পড়েন। মুক্তদাহ গ্রামে বিয়ে সূত্রে বসবাসকারী সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের গোয়ালপোতা গ্রামের ইসমাঈল হোসেনের ছেলে ফজলুর রহমান রাজু তাদেরকে ফুঁসলিয়ে পানিপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানোর পর থেকে আজও তারা নিখোঁজ রয়েছেন।
২০১৩ সালের ১ জুন বাড়ি থেকে একযোগে বের হন তারা। ১২ জুন অমিত হাসান মুকুল বাড়িতে ফোন করে বলেন, আমরা সবাই পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেব। ওই কথাই ছিল তাদের পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা।
মুকুলের স্ত্রী চামেলী খাতুন বলেন, যে নাম্বার থেকে ফোন দিয়েছিল সেই নাম্বার বন্ধ পেয়েছি। বারবার চেষ্টা করেও ফোনে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর ছয়টি বছর কেটে গেলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অতিকষ্টে দিন কাটছে আমাদের।
নিখোঁজ শরিফুল ইসলাম খোকনের স্ত্রী রেশমা বেগম তার ৩ মেয়ে এবং ফুলজার রহমানের স্ত্রী রূপভান বেগম দুই মেয়ের লালনপালনের জন্যে স্থানীয় ডিভাইন গার্মেন্টসে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তারা দুজন এবং আজিজুর রহমানের মা মনোয়ারা বেগম (৬০) বলেন, অনেক চেষ্টা করেও তাদের খোঁজ পাইনি। এদের মধ্যে নিখোঁজ আজিজুর রহমানের স্ত্রী দুটি সন্তান ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন।
তারা জানান, নিখোঁজের তিন মাস পর তারা মুক্তদাহ গ্রামের ঘরজামাই আদম ব্যাপারি রাজুর কাছে যান। স্বজনদের ফেরত পেতে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় রাজু তার সহযোগী চট্টগ্রামের টেকনাফের অপর আদম ব্যাপারি রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন। টেকনাফের দালাল রাশিদুল তাদেরকে বলেন, কোনো সমস্যা নেই। তারা দুই-একদিনের মধ্যেই মালয়েশিয়ায় পৌঁছে যাবেন।
কিছুদিন পরই মুক্তদাহ গ্রামের ঘরজামাই দালাল রাজু তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে রাতের আঁধারে আত্মগোপনে চলে যান। পরে টেকনাফ ও মুক্তদাহ গ্রামের দালালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর রাজু একই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের মেয়ে রনি বেগমকে বিয়ে করেন। সেখানে যাতায়াত করলেও নিখোঁজদের পরিবারগুলো তা জানতো না। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর রোববার রাতে রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে ওই পরিবারের সদস্যরা ধরে মুক্তদাহ গ্রামে নিয়ে যান। পরে তাকে চৌগাছা থানায় সোপর্দ করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এ ঘটনায় অমিত হাসান মুকুলের পিতা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭ ধারায় একটি মামলা করেন। মামলায় টেকনাফের দালাল রাশেদুল ইসলাম ও দালাল আলমকে আসামি করা হয়। পুলিশ মামলায় ফজলুর রহমান রাজুকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার দুপুরে আদালতে পাঠিয়েছে।
নিখোঁজ মুকুলের পিতা আতিয়ার বলেন, ঘটনার প্রথম দিকে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু আদম ব্যাপারিদের কোনো সন্ধান পাইনি। আমার ছেলেসহ চৌগাছার ৭ জন ছাড়াও ঝিকরগাছা উপজেলার আরো আটজন এই দালালদের খপ্পরে পড়ে পানিপথে মালায়েশিয়ায় রওনা দেন। প্রায় সাত বছর পার হতে চললেও কারো কোনো সন্ধান পায়নি। অবশেষে রোববার সন্ধ্যায় দালাল রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে কৌশলে আমাদের গ্রামে নিয়ে যায়।
চৌগাছা থানার ওসি রিফাত খান রাজীব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আটক দালাল রাজুকে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য
Loading...