আইনের ঊর্ধ্বে মোটরশ্রমিক!

ধর্মঘট প্রত্যাহার করেও বাস চলাচল বন্ধ, জিম্মি সরকার ও গাড়ি মালিক!

১১৩

এইচ আর তুহিন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও খুলনা বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার সকালেও খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর ও বগুড়া বিভাগের কিছু কিছু জেলায় সীমিত আকারে বাস চলাচল করে। খুলনা বিভাগের শ্রমিকরা একেবাড়ে অনড় অবস্থায় রয়েছে। দুপুরের পর থেকে যশোর জেলা পরিবহন শ্রমিক সংস্থার সভাপতি ও সম্পাদক মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন। অনেক যাত্রী বলেন, মোটরশ্রমিকরা কি আইনের ঊর্ধ্বে। তারা সরকার ও গাড়ির মালিকদের জিম্মি করে রেখেছে। সাধারণ মানুষকে নিয়ে তারা খেলা করছে।

ঘোষণা ছাড়াই যশোর অঞ্চলের ১৮ রুটে টানা কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট পালন করছেন শ্রমিকরা। সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধনসহ দশ দফা দাবিতে গত রোববার সকাল থেকে পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহন চলাচলও বন্ধ ছিল তিনদিন। বৃহস্পতিবার থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করলেও আন্তঃজেলা বাস চলাচল করেনি। শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। রোববার রাতে পুলিশ প্রশাসন শ্রমিক নেতাদের সাথে বসলে সোমবার থেকে বাস চলাচলের আশ্বাস দিলেও এদিন সকাল থেকে তারা বন্ধ রাখে।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, শাস্তির খড়গ নিয়ে রাস্তায় নামতে চাইছে না শ্রমিকরা। এজন্য স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। আর বৈধ কাগজপত্রের চালকরা বলছেন, অবৈধ কাগজপত্রের চালকরা মাঠে নামতে পারছে না। শ্রমিক নেতাদের ইন্ধনে তারা ধর্মঘট পালন করছে। এক্ষেত্রে অনেককেই বাধ্য করা হচ্ছে।

কয়েকজন শ্রমিক জানান, বৈধ কাগজপত্রের চালকরা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে চাইলেও বাধার সম্মুখিন হচ্ছেন। ওইসব গাড়ির চালকদের দাবি, শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে জিম্মি করছে। এজন্য বৈধ কাগজপত্র থাকলেও অনেক চালক নামতে পারছে না।

শহরের খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে একাধিক যাত্রী বলেন, ঘোষণা ছাড়াই পরিবহন ধর্মঘট চলছে। অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। বৈধ কাগজপত্র  না থাকলে রাস্তার নামার দরকার নেই। কিন্তু যাদের বৈধ কাগজপত্র যাদের আছে, তারা কেন গাড়ি বন্ধ রাখবে। তাদেরকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হোক।

শহরের পালবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে সাইদুল ইসলামে নামে এক যাত্রী বলেন, জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি কেউ আমলে নিতে চায় না। সবাই নিজেদের ধান্দায় ব্যস্ত। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কঠোর হওয়া উচিত।

যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি’র সভাপতি মামুনূর রশীদ বাচ্চুর মোবাইল ফোন বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে তিনি বলেছিলেন, বৈধ কাগজপত্রের গাড়ি ও চালকদের বাধা দেয়া হচ্ছে না। ৯০ শতাংশ চালক রাস্তায় নামছে না। সবাই স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করছে। যদি কেউ অভিযোগ করে, সেটি সঠিক নয়।

মামুনূর রশিদ বাচ্চু আরও বলেন, শ্রমিকদের কর্মবিরতি মালিক ও শ্রমিকদের কোনো সংগঠন ডাকেনি। ফাঁসির দড়ি সামনে নিয়ে শ্রমিকরা পরিবহনে কাজ করতে রাজি নয়। তাই তারা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেছে। এটা কোনো ইউনিয়ন বা ফেডারেশনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নয়। পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছামতো কর্মবিরতি শুরু করেছেন।

যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অসীম কু-ু বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। দুপুর থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চলাচল এখনও শুরু হয়নি। শ্রমিক-নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের ফোন নম্বর বন্ধ আছে। অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চালু করার জন্য শ্রমিকও মিলছে না।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে খুলনায় চতুর্থদিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে বাস ছাড়বে এমন খবরে খুলনার সোনাডাঙ্গা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, রয়্যাল ও শিববাড়ির মোড়ে শতশত যাত্রীরা দূর-দূরান্তে যাত্রার উদ্দেশ্যে আসলেও বাস না ছাড়ায় তাদের যাত্রা ভঙ্গ হয়েছে।

খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, নতুন সড়ক আইনের কিছু ধারায় মালিক ও চালকদের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ কারণে চালক ও মালিকরা ভয়ে গাড়ি বের করছেন না।

সাতক্ষীরা অফিস জানায়, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণার পরও সাতক্ষীরায় চলছে অঘোষিত বাস ধর্মঘট। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাতক্ষীরায় চতুর্থ দিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করছে শ্রমিকরা। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চলাচল। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্তের যাত্রীরা। ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, ইঞ্জিনভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে তারা যাতায়াত করছেন। তবে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও বিআরটিসিসহ সীমিতসংখ্যক ট্রাক চলাচল করতে দেখা গেছে।

বাস টার্মিনাল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জানান, চালকেরা জেল-জরিমানার ভয়ে স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। তবে সার্বিক বিষয় নির্ভর করছে শ্রমিক ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের ওপর।

ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোমরা স্থলবন্দরে। ফলে বিপাকে পড়েছেন বন্দরের ব্যবসায়ীরা। ট্রাক ঠিকমতো না পাওয়ায় তাদের দ্বিগুণ খরচে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। বন্দর থেকে সীমিত সংখ্যক ট্রাক মালামাল নিয়ে বন্দর ছাড়ছে বলে জানা গেছে। নষ্ট হচ্ছে পচনশীল দ্রব্য।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, নড়াইলে চতুর্থ দিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নড়াইলের কোনো বাস ছাড়েনি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন  শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল জেলা বাস মিনিবাস  শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান বৃহস্পতিবার সকালে বলেন, বাস ধর্মঘট অব্যাহত আছে। আমরা এখনো ঢাকায় আছি। বেলা ১১টায় এ বিষয়ে বৈঠকে বসব। পরে সিদ্ধান্ত জানাবো।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে চুয়াডাঙ্গায় চতুর্থ দিনের মতো পরিবহন ধর্মঘট চলছে। মধ্যরাতে ট্রাক ও পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) সকাল থেকে কোনো পণ্যবাহী পরিবহন ছেড়ে যায়নি। দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা রুটে সব ধরণের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রাজবাড়ী : ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও রাজবাড়ীতে চলছে না কোনো ধরনের যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক। বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) সকাল থেকে জেলার সড়কগুলোতে কোনো বাস-ট্রাকের দেখা মেলেনি। যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।

মন্তব্য
Loading...