যশোরে তৃতীয় আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব : ‘মাতব্রিং’র সফল মঞ্চায়ন

১৮৪

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিবর্তন যশোরের দ্রোহ প্রেম ঐতিহ্যের স্বপ্নযাত্রার শ্লোগানে তৃতীয় আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের দ্বিতীয়দিন মঞ্চস্থ হয়েছে আয়োজক সংগঠনের নাটক মাতব্রিং। রোববার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে বিবর্তনের নাট্যকলাকুশলীরা উপস্থাপন করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মান্দিদের নানা উপকথার হৃদয়স্পর্শী সংলাপ গাঁথা, সাধনা আহমেদ রচিত নাটক মাতব্রিং। এর নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক।
নাটকের কাহিনি ও এর উপস্থাপনা বিস্তৃতিক্রম এরকম : মায়ের গর্ভনাড়ী থেকে উত্থিত রক্তেভেজা রূপকথার মতো সে কোনকালের এক মান্দি-গোত্রনারী সূচনা করেছিল ফসল তোলার উৎসব ওয়ানগালার, যার মাদকতা মান্দিযুবক কানু সাংমার চোখে নেশার ঘোর লাগিয়ে রাখে। প্রেমে উন্মত্ত হয়ে আরেক মান্দিযুবতী মিত্তি মারাকের পায়ের মলের শব্দের পেছনে বৃক্ষের আড়ালে আড়ালে অবিরাম ছুটে চলে সে। আর মিত্তি তার পোষা ফইট্যার (খরগোশ) পেছন পেছন ছুটে চলে। তা দেখে কানুর চোখেমুখে ঈর্ষার আগুন লকলকিয়ে ওঠে, কানু ভাবে আমি মিত্তিকে এত ভালোবাসি, কিন্তু মিত্তি খালি তার খরগোশকেই ভালোবাসে কেন? মুহূর্তে কানু তার বর্শা দিয়ে মিত্তির খরগোশকে হত্যা করে। তা দেখে অরণ্যবিদারী চিৎকারে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মিত্তি। কানু গিয়ে মিত্তিকে ধরতেই বাঘিনীর মতো কানুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মিত্তি, কিল চড় লাথিতে ঘুসি মেরে চলে যায়। আর তাতেই মিত্তির স্পর্শে পুলকিত কানু। কিছুক্ষণ পরে বনের ভেতর থেকে মিত্তির আর্তচিৎকার শুনতে পেয়ে কানু ছুটে গিয়ে দেখে এক বুনোষাঁড় মিত্তিকে তাড়া করছে। প্রচ- লড়াইয়ের মাধ্যমে ষাঁড়বধ করে কানু, তা নিয়ে মান্দিপল্লী ভোজের উৎসবে মাতে। সেখানে আনন্দে নেচে চলে কানুর ঠাকুমা কলাবতী সাংমা। তার বয়স কত কেউ জানে না, সে অবিরাম বলে চলে মান্দিদের নানা উপকথা।
প্রেম হয়ে যায় মিত্তি ও কানুর। কিন্তু মিত্তির মা রুগালা মারাক্ কানুর সাথে মেয়ের বিয়ে দেবে না। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক জীবন বাস্তবতায় রুগালা মারাক্ দেখেছে উন্নয়নের নামে বার বার তাদের ভূমি দখল হওয়ার ফলে এখন আর চাষের জমি অবশিষ্ট নেই। জুমচাষ বন্ধ, সব খাবার কিনতে হয় টাকা দিয়ে। তাই সে তার মেয়েকে শহরে পাঠাবে টাকা রোজগার করতে। মায়ের একথা শুনে কানু আর মিত্তি জঙ্গল সাফ করে চাষের জমি বের করে আবার চাষ করার স্বপ্ন দেখে। একথা শুনে মিত্তির মা মনে করিয়ে দেয় এখন আর জঙ্গল কাটা যায় না। কারণ জঙ্গল আর তাদের নয়, জঙ্গল এখন সরকারের। কানু ভাবে জঙ্গল আর তার নয় তবে কি মিত্তিও তার নয়? এই সত্যের মুখোমুখি হয়ে পর্বত আর নদীর জাতক কানু, টাকা রোজগারে জন্য নগরের কাছে এক বিলাস-বহুল রিসোর্টে রাতপ্রহরীর চাকরি নিয়ে চলে যায়। কানুর প্রতীক্ষায় যুবতী মিত্তির দিন যেন আর কাটে না। মিত্তির মা তাকে শহরে পাঠাতে চায়। তবে মিত্তি কানুর জন্য অপেক্ষা করবে কিছুতেই শহরে যাবে না বলে জানায়।
এমন সময় ‘দেশ হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপিং কোম্পানি’ আধুনিক পর্যটননগরী গড়ে তোলার জন্য মান্দিপল্লীর পুরো এলাকা লিজ নেয়। নিজেদের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মান্দিদের বসতভিটা উন্নয়নে মান্দিদের সাথে চুক্তি করতে চায় তারা। কিন্তু কলাবতী সাংমা মান্দিদের মনে করিয়ে দেয় তাদের উপরে বয়ে যাওয়া যুগ-যুগান্তরের অত্যাচারের ইতিহাসের কথা। তাতে মান্দিরা দো-টানায় পড়ে। তারা কি আবার ভূমি হারাবে? আবার উচ্ছেদ হয়ে কোথায় যাবে তারা? হাউজিং কোম্পানি ও মান্দিদের মৈত্রী চুক্তি কি হবে? কানু কি ফিরে আসবে মিত্তির কাছে?
রচয়িতার কথা : নাটকের রচয়িতা সাধনা রহমান তার রচনা সম্পর্কে বলেন, ‘মাত্ব্রিং’ আচিক ভাষার একটি শব্দ যার অর্থ ‘গভীর অরণ্যচারী’। আদিকাল থেকেই পৃথিবীর নানাপ্রান্তে পরাক্রম জাতিরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতিদের ভূমি বিজয়ে বেরিয়েছে। সেই অশ্বখুরধ্বনি থামেনি কখনো। সাপের খোলস বদলের মতো কালে-কালে, যুগে-যুগে রূপ বদল হয়েছে মাত্র। রাজকর, শষ্যকর, কৃষিজমি উদ্ধার, অরণ্যের মানুষদের উপাস্য ঈশ্বরের চেয়ে আরো উত্তম ঈশ্বরের উপাসনায় তাদের দীক্ষা দেয়া কিংবা তথাকথিত সভ্য মানুয়ের মতো অরণ্যচারীদের জীবনমান উন্নয়ন। এমনই নানা বাহানায় নানা রূপে পৃথিবীর বুকে আজও বয়ে চলছে সে রক্তনদীর ধারা। মানবসৃষ্ট সভ্যতা নামক এই দুর্যোগের কারণে, অনবরত অরণ্য ধ্বংস ও অরণ্যের মানুষদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীগোলকের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কত টোটেমের পর টোটেম, কত মানবজনপদ হারিয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে। হায়, সৃষ্টির আদিতে জন্মেছিল যে গুহামানব, কাল থেকে কালান্তর যুগ থেকে যুগান্তর ভূমিলোলুপ শত্রুর কাছে মেনেছে পরাভব। এ যেন অন্তহীন অনন্ত এক বেদনার আখ্যান। বাজার অর্থনীতির পৃথিবীর কাছে এ আখ্যানের হিসেব রাখার প্রয়োজন হয়তো নেই। কিন্তু সে আখ্যান বার বার আমায় রক্তাক্ত করেছে, তাই এই নাটক লেখার প্রয়াস।
এই আখ্যান লিখতে গিয়ে আমি মান্দি নামক একটি জাতিগোষ্ঠীর জীবনকে আশ্রয় করেছি। প্রাথমিক পা-ুলিপিতে মান্দি গোষ্ঠীর বাসভূমি উচ্ছেদ থেকে শুরু করে নানা সমস্যা অঙ্গীভূত হওয়ার কারণে ‘প্রেম’ বেশ একটু উপেক্ষিতই ছিল। নাটকটির নির্দেশক বন্ধুবর ইউসুফ হাসান অর্ক’র সাথে আলোচনার পর, প্রাথমিক পা-ুলিপিতে উপস্থিত, কানু ও মিত্তি নামক এই মান্দি যুগলের উপেক্ষিত প্রেমকেই, ‘মুক্তির শক্তি’ রূপে আশ্রয় করেছি। তাদের প্রেমকে ঘিরে আমার হৃদয় হাজার রঙের রামধনু ছুটিয়েছে। নাটকের চিত্রপটে প্রেমময় প্রাকৃত নর-নারীর চিত্র আঁকতে আঁকতে আমার দিনরাত গুণগুণ করেছে তাদেরই সঙ্গীতে। আমার বাতাস সুবাসিত হয়েছে তাদেরই প্রাকৃতগন্ধে। মিত্তি ও কানুর প্রেম কিংবা ভূমি হারানোর বেদনা আমায় প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। মাতাল করেছে। দ্রোহী করেছে। ‘মাত্ব্রিং’ নাটকটিতে আমি সহজ করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মানুষের সেই প্রেম ও যন্ত্রণার কথাই বলেছি মান্দি চরিত্রগুলোর চলার চলনে, বলার বলনে। তবে এই আখ্যানের অন্তঃ¯্রােতে কেউ প্রকৃতির সাথে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম সভ্যতার দ্বন্দ্ব খুঁজে পেলেও পেতে পারেন।
নির্দেশকের কথা : নাট্য নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক নাটক সম্পর্কে বলেন, আমাদের দেশে প্রান্তিক বা বিশেষ কোনো অঞ্চলে বসবাসরত বেশকিছু জাতিগোষ্ঠী রয়েছে যাদের অভিধা নিয়ে মতদ্বৈততা এখনো এদেশের বিদগ্ধ মহলে বিদ্যমান। এদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা নিয়ে নানান গবেষণাসহ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক শহুরে মঞ্চে ‘নৃগোষ্ঠী নাট্য’ অভিধা দিয়ে নিরীক্ষাধর্মী নাট্য প্রযোজনার প্রয়াসও হয়েছে বিস্তর। আমাদের প্রয়াস ‘নৃগোষ্ঠী নাট্য’ নির্মাণ নয়, বরং মান্দি নামক একটি জাতিগোষ্ঠীর জীবনকে প্রেক্ষাপট ধরে তার মধ্য দিয়ে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চিরায়ত সংকটকে ছুঁয়ে যাওয়াই উদ্দেশ্য।
এখানে চরিত্রেরা নিজেদের মঞ্চক্রিয়াসহ মনোজগৎ ব্যাখ্যা করে। কখনো কথায়, কখনো আঙ্গিকাভিনয়ে, কখনো গীতে-নৃত্যে। বর্ণনার সাথে সংলাপের ভেদ আবিষ্কার করতে না পেরে অনেকে নালিশ করেন। আমার বক্তব্য হলো, ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের নাট্য যদি বিবেচনায় রাখি সেখানে গায়েনের মুখনিঃসৃত সকল কথাই একাধারে সংলাপ এবং বর্ণনা। সেখানে ভেদ টানা দুষ্কর। কথা-গীত-নৃত্য নিয়ে এক অদ্বৈত সন্নিবেশসহ বাংলা বর্ণনাত্মক রীতি নাট্যে প্রযুক্ত হয়। তাই ব্রেখটের নাটকের সাথে তাকে তুলনা করে এর স্বকীয় সম্ভাবনাকে উড়িয়ে না দেয়াটাই প্রকৃত বাঙালিয়ানা। আমরা সেটা রাখবার চেষ্টা করেছি।
নাটকটিতে অভিনয় করেছেন তাতারারাবুগা/কথক ভূমিকায় সানোয়ার আলম খান দুলু, নক্মা-নওরোজ আলম খান চপল, কানু-কামরুল হাসান রিপন, মিত্তি-অর্পিতা সিকদার তুলি, কলাবতী সাংমা-রুহিনা শারমিন এলিস, সুসিমি-শাহারিন সুলতানা, রুগালা-শারমিন সুলতানা সাথী, সঞ্জু-কমল বিশ্বাস, নিখি-দেবাশীষ মল্লিক, সিধু-আসিফ খান, দিগেন-ভগিরত পাল, অ্যান্টনী-শেখ জাহিদ, ছোট সাহেব-মানস বিশ্বাস, চামচা-সুমন ব্যানার্জী, ষাঁড়-আতিকুজ্জামান রনি, ফরেস্টার-দেবদুলাল রায়, মান্দিবাসী-জুনিথা দাস তুলি, লাবণ্য বিশ্বাস, বাঁধন সরকার, সাধন মল্লিক রনি, সঞ্জয় দফাদার, নিশিত সরকার, তন্ময় রায়। পুলিশ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাম প্রসাদ রায় ও আতিকুজ্জামান রনি।
নাটকের সংগীত পরিবেশন করেছেন মৌসুমী আক্তার বন্যা, কাজী পলাশ ইসলাম ও কমল বিশ্বাস। অন্যান্য কলাকুশলীরা হলেন পোশাক পরিকল্পনায় আইরিন পারভীন লোপা, আলোক পরিকল্পনায় শাহীন রহমান, সেট পরিকল্পনা করেছেন ইউসুফ হাসান অর্ক, কোরিওগ্রাফ-অদিতি সরকার রুমা।

মন্তব্য
Loading...