‘রায় বাহাদুর যদুনাথকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে’

সাক্ষাৎকারে পরিবারের সদস্যদের আহ্বান

২৬০

ইন্দ্রজিৎ রায় :
রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার ছিলেন একজন বাঙালি সম্পাদক, আইনজীবী ও সাহিত্যিক। শত বছর আগেও যশোরের উন্নয়নে নিবেদিত ছিলেন। তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজো মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারই দান করা জমিতে গড়ে উঠেছে পাবলিক লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান। যেটি আজ জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে এ অঞ্চলে আলো দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই মানুষটি আজ অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মের সামনে ফিকে হয়ে আসছে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের নামটি। তাঁর অবদান কি ধুলোর আস্তরণে চাপা পড়ে যাবে একদিন? প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে। এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের কাছে যদুনাথ মজুমদারকে তুলে ধরার। আর এ কাজটি করার জন্য নিবেদন জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
শনিবার যশোর সার্কিট হাউজে একান্ত সাক্ষাৎ হয় যদুনাথ মজুমদারের ভ্রাতুষ্পুত্র ডা. সূর্য্য কুমার মজুমদার ও তার সহধর্মিণী ডা. শিপ্রা মজুমদার, মেয়ে ডা. শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য মজুমদার ও তার স্বামী ডা. গৌরব দীপ ভট্টাচার্যের সাথে। তারা যশোরে এসেছেন তাদের পূর্ব পুরুষের ভিটে মাটিতে, শেকড়ের কাছে। সাক্ষাৎকারে বলছিলেন তারা, যশোর উন্নয়নে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের অবদান অনেক। তবে নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি দিন দিন অচেনা হয়ে যাচ্ছেন। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের দুটো দাবি আছে যশোরবাসীর কাছে।
প্রথমত, বছরের অন্তত একটি দিন এপার বাংলা, ওপর বাংলা মিলে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের জন্মদিন (২৩ অক্টোবর) ধুমধামে পালন করা। কারণ আমরা যেটা মুখে বলছি, সেটা ভেতর থেকেও মানছি কিনা। উনার (যদুনাথ মজুমদার) অনেক অবদান যশোর শহরে। শিক্ষায় বলুন, অগ্রগতিতে বলুন। তাকে অন্তত একদিন স্মরণ করলেও নতুন প্রজন্মের কাছে তার অবদান জ্ঞাত হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে যশোর কাছে। এজন্য দুই বাংলা মিলে যশোরে জন্মোৎসব উদযাপনের আয়োজন করা হোক।
দ্বিতীয়ত, যশোর শহরের জনবহুল, জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকার নামকরণ রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের নামে হওয়া উচিত। সড়ক কিংবা সরণির নামকরণের মধ্যে দিয়েও তাকে স্মরণ করা যেতে পারে। এই দুটো প্রধান দাবি পূরণের মধ্যদিয়ে যদুনাথ মজুমদারকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। তারা আরো বলেন, আপনারা যতদিন রায়বাহাদুর যদুনাথ বাবুকে মনে রাখবেন। যতদিন আমরা এখানে আসবো, আর আপনারা যাবেন, ততদিন যেন সম্পর্কটা থাকে। আজকে আপনারা যে সম্মান দিচ্ছেন, আমরা যেন এই সম্মান পাওয়ার যোগ্য হই। রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারে মেজ ভাই পঞ্চানন মজুমদারের ছেলে সূর্য্য কুমার মজুমদার বলেন, যশোর সম্মিলনি ইনস্টিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেছি। ১৯৪৭ সালে দেশ ছেড়েছি। শহরের ঘোপে আমাদের বাড়ি। নিজের দেশে এসে ভালো লাগছে। রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার আমার জেঠু মহাশয়। তিনি সমাজের কল্যাণে কাজ করেছেন। তাকে স্মরণে জন্মোৎসব ও সড়কের নামকরণ দাবি জানাচ্ছি।

১৩ অক্টোবর ২০১৮ চাঁদের হাট যশোরের পক্ষ থেকে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয় -প্রতিদিনের কথা

শিপ্রা মজুমদার বলেন, তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। কখনো নিজের নামের জন্য কাজ করেনি। তাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিত। ডা. গৌরব দীপ ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের মুমূর্ষু রোগীদের কলকাতা বা ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য যারা যান, তাদের অনেকে হয়রানির শিকার হন। সেই জায়গাটাকে আমরা মসৃণ করতে চাই। আমার মিসেস শর্মিষ্ঠা। ওরা একটা অর্গানাইজেশন করেছে। প্রফেশনাল অর্গানাইজেশন। অর্গানাইজেশনটি এদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীর সহায়তায় কাজ করবে। ধরুন, যত আয়, তত ব্যয়ের মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিবে। অর্থাৎ আপনার টাকা অনুযায়ী কোথায় ডাক্তার দেখাতে চান, সেখানে ব্যবস্থা করে দিবো।
এ প্রসঙ্গে শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য মজুমদার বলছিলেন, আমরা হয়তো একটা সার্ভিস চার্জ নিবো। কিন্তু চিকিৎসা সেবা নিতে যাওয়া মানুষগুলো যেন হয়রানিমুক্ত সেবা পায়, সেই ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। প্রতিষ্ঠানটির নাম দিচ্ছি ‘সেভিয়ার লেট যদুনাথ মজুমদার লেগেসি রিমেন্স’। উনি (যদুনাথ) এদেশের মানুষের জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু আমরা হয়তো অতটা করতে পারছি না। তবুও মানুষ যাতে সহযোগিতা পায়। সেজন্য এই উদ্যোগ নিয়েছি। উল্লেখ্য, যদুনাথ মজুমদার ১৮৫৯ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অর্ন্তগত লোহাগড়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রসন্ন কুমার মজুমদার যশোরের দেওয়ানি আদালতে কর্মরত ছিলেন। যদুনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯০৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হতে ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত যশোর জেলা বোর্ড ও যশোর পুরসভার (পৌরসভার) সভাপতি ছিলেন। এসময় তিনি যশোরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৮৮৯ সালে তিনি যশোর শহরে সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন নামক একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তার জন্মস্থান লোহাগড়ার বাসস্থানে লোহাগড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয় ও যশোরের বাসস্থানে আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এছাড়াও যশোরের সুফলাকাটি হাই স্কুল, রাজঘাট হাই স্কুল ও বরিশালের কদমতলা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের ভ্রাতষ্পুত্র ডা. সূর্য্য কুমার মজুমদার, তার সহধর্মিনী ডা. শিপ্রা মজুমদার ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ -প্রতিদিনের কথা

শনিবার চাঁদের হাট যশোরের পক্ষ থেকে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয় -প্রতিদিনের কথা

মন্তব্য
Loading...