যশোর ক্রিকেটে কাজের লোক দূরে সরে যাচ্ছে

সাক্ষাৎকারে দেশসেরা কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু

২৮০

ক্রিকেটে জয়-পরাজয়ে পিচের একটা ভূমিকা থাকে। এই পিচ তৈরি করেন কিউরেটররা। নানা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন তারা। অনেক সময় তুলোধুনা করা হয় তাদেরকে।  তার মানে ক্রিকেট ম্যাচে তাদের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। দেশের একজন সেরা কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু। যার বাড়ি যশোরে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এই সুযোগ্য কিউরেটর এখন দায়িত্বে আছেন চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের। এখানে আছেন প্রধান কিউরেটর হিসেবে। তার অন্য পরিচয়Ñ ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটের উদায়চল ক্লাবের কর্মকর্তা। জাহিদ রেজা বাবু ক্রিকেটার মাশরাফির অতি ঘনিষ্ঠজনও বটে। কেউ কেউ বলে থাকেনÑমাশরাফিকে তিনিই নাকি আবিষ্কারক করেছেন। এটা জাহিদ রেজা বাবু নিজে অবশ্য মানতে চান না। এই গুণীমানুষটির জন্ম শহরের আরবপুরে। একসময় তিনি ঢাকা তৃতীয় বিভাগের লালমাটিয়া ক্লাবের ফুটবল ক্যাপ্টেন ছিলেন। ফুটবল খেলেছেন যশোর জেলা যুবদলের হয়েও। সম্প্রতি তিনি ছুটিতে বাড়িতে আসেন বেড়াতে। এক ফাঁকে যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের বাসায় কথা হয় তার সাথে। সেই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ক্রিকেটের অনেকগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেসবের নির্বাচিত অংশ এখানে পত্রস্থ করেছেন- প্রতিদিনের কথার ক্রীড়া প্রতিবেদক এম এ রাজা।

নিজেকে কীভাবে ক্রিকেটের সাথে জাড়িয়ে ফেললেন বলবেন?

-আমি মূলত ফুটবলার ছিলাম। ১৯৮২ সালের দিকে যশোর জেলা যুব দলের হয়ে খেলেছি। তখন আমরা পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলতাম। ক্রিকেট ছিল আমার কাছে ফানি গেম। যেহেতু ফুটবলার ছিলাম সেহেতু ফিল্ডিং ভালো করতাম। আমাদের কিছু বন্ধু ক্রিকেট খেলতো। আমার মনে হয় দুই বছর যশোর লিগ খেলেছি। ১৯৮৩ সালে চাঁদপুরে যুব ফুটবল খেলতে গিয়ে ঢাকায় থেকে গিয়েছিলাম বোনের বাসায়। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। ওখানে সবাই ক্রিকেট খেলতো। একটা টিম ছিল ইউনাইটেড হিরোস। আমি যেতাম, তবে খেলতাম না। যাওয়ার সময় আমাদেরকে সাদা ড্রেস পরে যেতে হত। মাঝে মাঝে ফিল্ডিং করতে নামতে হত। হঠাৎ একদিন প্লেয়ার আসতে দেরি করছে দেখে ওরা আমার বলে, ‘তুই খেল’। আমি ওপেন করতে নামছিলাম। প্রথম খেলায় ৪৮ নট আউট ছিলাম। ১১০ রানে অল আউট হয়েছিলাম আমরা। ওরা আবার নব্বই রানে অল আউট হয়েছিল। আসলে ওই ইউনাইটেড হিরোস থেকে ক্রিকেটে ইন্টারেস্টটা শুরু।

আপনি ১৯৯৪ সালে ‘উদায়চল ক্লাব’ নামে একটা ক্রিকেট ক্লাব করেছিলেন। তো এটা কেন করেছিলেন

– ওই সময় আমরা বিভিন্ন যায়গায় খেলতাম। মাথায় আসে পরের টিমে খেলে লাভ কী! আর আমি যখন ফুটবল খেলতাম তখন ভালো খেলা সত্ত্বেও কেউ ঢাকার ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেয়নি। এসব চিন্তা থেকে আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিই একটা ক্লাব করব। দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে উদয়াচল নামে একটি ক্লাবের এন্ট্রি করায়। প্রথবার কোয়ালিফাইং করেই রানার্স-আপ হয় দল। সুযোগ পেয়ে যায় দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে। ক্লাব দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট সুযোগ পাওয়াতে আমিও সুযোগ পেয়ে যায় ক্রিকেট বোর্ডে যাওয়ার। বর্তমানে ক্লাবটি ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলছে।

ছিলেন ক্লাব কর্মকর্তা, এখন দেশ সেরা কিউরেটর। ব্যাপারটা শেয়ার করবেন?

-ক্রিকেট বোর্ডে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর কিভাবে আরো সম্পৃক্ত হওয়া যায় সেই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেত। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে একটা আন্তর্জাতিক ট্যুর ছিল বাইরের দেশের। ওই সময় ভলানটিয়ারদের নিয়ে বিভিন্ন কমিটি হত। আমি বললাম আমাকে নিতে হবে। আমি ‘গেট ল অর্ডার অ্যান্ড সিকিউরিটি’ কমিটিতে কাজ করার সুযোগ পায়। আমার মনে আছে কার্ড পেতে রাত দুইটা  বেজেছিল। এভাবে দুই বছর কাজ করলাম। এরপর তখনকার বোর্ড ডাইরেক্টর কলাবাগানের আলম চৌধুরী আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তার কাছে গিয়ে বললাম আমি মাঠে কাজ করতে চাই। প্রথম দিকে তিনি (আলম চৌধুরী) কাজ দিতে চাননি। আমার এইম ছিল মাঠে ঢোকার। সেই লক্ষ্যে আমি লেগেছিলাম। সবার কাজ দেখতে থাকলাম। এক বছর এভাবে কে কি করে দেখতে থাকলাম। তখনও পিচ আমি দেখি না। আলম ভাই দেখছিলেন। উনার কাছ থেকে অনেককিছু শিখেছি, জেনেছি। ১৯৯৮ সালে যখন নাইন নেশন টুর্নামেন্ট হল, তখনই আমি কিউরেটরের কাজে জড়িত হলাম। তখন ফতুল্লায় কেবল মাত্র কাজ শুরু করেছি আমরা। পরে ২০০১ সালে দুবাইতে ১৫ দিনের কিউরেটরের কাজের উপর প্রশিক্ষণ নিতে যায়। ফিরে আসার বোর্ডের সাথে বনিবনা হয়নি বলে কাজ থেকে বাইরে ছিলাম। ২০০৬ সালে আবারো বিসিবির কাজে ফিরি। ২০১০ সালে আমি সর্বপ্রথম ভেন্যু পায় চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেই থেকে এখানেই কাজ করছি। তবে মাঝে মাঝে খুলনায় কাজ করেছি।

আপনি মানেই বাংলাদেশের জয়ের পাল্লা ভারি। এমনটা কেন- ব্যাখ্যা করবেন?

-আসলেই হারের সংখ্যাটা কম। বাংলাদেশ দল ভালো খেলে তাই সাফল্য পায়। উইকেটেরও ব্যাপার আছে। চেষ্টা করা হয় আমাদের মতো করে পিচ বানানোর। এমন উইকেট বানানোর চেষ্টা করি, যাতে বাংলাদেশ দল ভালো করে। পৃথিবীর যে কিউরেটরই পিচ বানাক, তিনি কিন্তু শতভাগ বলতে পারবেন না পিচের আচরণ কী হবে। পিচের সত্যিকারের আচরণ নিয়ে বলা মুশকিল।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ পিচই স্পিন সহায়ক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবুজ বাউন্সি উইকেট বানানো সম্ভব?

-আমাদের দেশেও এমন পিচ বানানো সম্ভব। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে পিচ কেমন হবে। এছাড়া পিচ তৈরি করতে যেয়ে অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে। অনেকে মনে করে পানি দিলাম, রোল করে দিলাম হয়ে গেল। ভালো পিচ তৈরির প্রথম শর্ত হচ্ছে ঘাষ থাকতে হবে। পিচ মানেই ঘাস। এখন এই ঘাসেই স্পিন হবে, ঘাসেই পেস হবে, ঘাসেই ব্যাটিং উইকেট হবে। ঘাস ছাড়া কোনো দিন পিচ হবে না। ঘাস ছাড়া পিচ শুকাবে না। এবার আপনি খেলার আগে আপনার প্রয়োজন মত ঘাষ রেখে দেবেন। রোল করে কোনো দিন ভালো পিচ তৈরি করা যায় না। রোলে সমান করে। রোলে কখনো পিচ শুকাতে পারে না।

অনেক ম্যাচই মাঠে বসে উপভোগ করেছেন। স্মরণীয় হয়ে আছে কোনো ম্যাচটা?

– চট্টগ্রামের ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশে টেস্ট ম্যাচ। এই ম্যাচের মত ক্লোজ খেলা আমি জীবনেই দেখিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরে যায়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের স্ট্র্যাটেজিক চেঞ্জ হয়েছে ওই ম্যাচ থেকে। মুশফিক পরে সংবাদ সম্মেলনে আমার নাম ধরেই বলেছে যে আমরা যে ধরনের উইকেট চাই তা আগে কখনো পায়নি। বাবু ভাই-এর কল্যাণে প্রথম পেলাম।

মাশরাফির সাথে আপনার সম্পর্কটা জানতে চাই?

-মাশরাফির সাথে আমার সম্পর্ক অনেকে বুঝতে পারে না। জুনিয়র সাংবাদিকরা তো জানেই না। মাশরাফিকেও এই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। সর্বশেষ মাশরাফি এক সাক্ষাৎকারে বলেছে উনি আমার ক্রিকেটের অনেক উপরে, উনি আমার ফ্যামিলি মেম্বার, এরপর আর কিছু বলার নেই। আসলেই মাশরাফির সাথে আমার সম্পর্কটা ফ্যামিলি মেম্বারের মত। তবে আমি কখনো তার পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করি না।

টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেয়ার আগে মাশরাফি আপনাকে ফোন দিয়েছিলেন, এটা সবাই জানে। কী কথা হয়েছিল বলা যাবে?

– প্রায় ৩০ মিনিট কথা হয়। তবে ওই কথা পাবলিকলি বলার মত না। এইটা আমার জন্য খুবই পীড়াদায়ক ছিল। এখানে অনেক কিছু আছে ও (মাশরাফি) নিজে ভালো বলতে পারবে। হয়তোবা কোনো একদিন বলবে।

এবার যশোরের ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে চায়। একসময় যশোরের ক্রিকেটার ছাড়া খুলনা বিভাগীয় দল হত না। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবেও যশোরের খেলোয়াড়রা দাপটের সাথে খেলেছেন। এখন সেই অবস্থা নেই কেন?

– যা দরকার তার থেকেও বেশি কিছু নিয়েও খেলতে পারছে না। কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার অভাব। আমরা ফটো তোলার সময় সামনে আসলাম। চলে গেলাম। কিন্তু এর বাইরে আর দেখার কেউ নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলছি, আমি কাভার দিয়েছি ১০০ বাই ১০০। সেই কাভার এক সময় কেটে ইজিবাইকের ছাউনি করা হয়। এই কাভারগুলো আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে ব্যবহার করা হয়। আমরা ৮-৯টা উইকেট ঢাকার জন্য এই কাভার ব্যবহার করি। এরপরে নেট দেয়া হয়েছিল দুইটা। কিন্তু সেই নেট কেটে বাড়ি নিয়ে চলে গেছে। এগুলো দেখার কেউ নেই। পৃষ্টপোষকতার অভাব আছে। এখানে অনেক ক্রিকেট কোচিং সেন্টার আছে। এসব কোচিং সেন্টারগুলোতে গণহারে ভর্তি করায়। গণহারে খেললে তো ভাল ক্রিকেটার পাওয়া যাবে না।

তাহলে উত্তরণের পথটা কী ?

– নিয়মিত ভালো লিগ খেলতে হবে। ভালো অনুশীলন সুযোগ সুবিধা থাকতে হবে। যেটা একদমই নেই। যেটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কোন যায়গায় ভালো একটা অনুশীলন করার সুবিধা আছে। কোথায় ফিল্ডিং প্রাকটিস করবে? সেই দিন ক্রিকেট এগোবে যেদিন সবাই একসাথে কাজ করবে। বর্তমানে যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সব থেকে খারাপ জিনিস হচ্ছে কেউ কারও ভালো দেখতে পারে না। কাজের লোক দূরে সরে যাচ্ছে। যারা কাজ করবে না তারা ভরে যাচ্ছে। রোম (মঈনুদ্দিন রোম), বিপ্লব (আসাদুল্লাহ খান বিপ্লব), খাইরুজ্জামান বাবু, আমিনুল এরা ভালো লেভেলে ক্রিকেট খেলেছে। এদেরকে ইনভলপ না করলে ক্রিকেট এগোবে কি করে। এরা ক্রিকেটের বেসিকটা জানে। জেলা টিম গেল এদেরকে কোচ ম্যানেজার বানিয়ে দিলেও ভালো সমন্বয় হবে। এখানে ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে গেছে।

দেশে পিচ কিউরেটরকে পেশা হিসেবে নেয়ার মত পরিবেশ আছে কিনা?

– এটা একটা থ্যাকংলেস জব। কারণ জিতলে এক রকম। হারলে আমাদের দোষ। এই পেশা সম্পর্কে অনেকে জানে না। তবে এই পেশায় অনেক ইনজয় করা যায়। এই পেশায় ক্রিকেটারদের আসা উচিত। এটা লেখাপড়া জানতে হবে। এবং লেখাপড়া করতে হবে এই বিষয়ে। আর এক হয় তুমি হয়তো ১৫ বছর ধরে কাজ করছো সেটা হয়। সয়েল ডির্পাটমেন্টের কোন একটা ভালো স্টুডেন্ট যদি হয়, ভালো ক্রিকেটার হয়। একজন মহিলা কিউরেটর হিসেবে আসার চেষ্টা করেছিল তবে তা চলে গেছে।

মন্তব্য
Loading...